ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬

শিল্পী সমিতি নির্বাচন বিতর্কে যা বললেন জায়েদ খান

২০১৯ অক্টোবর ০৯ ১৬:৪৩:২৬
শিল্পী সমিতি নির্বাচন বিতর্কে যা বললেন জায়েদ খান

চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান। গত দুই বছরে তিনি শিল্পী সমিতির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আলোচিত হয়েছেন, পাশাপাশি সমালোচনায়ও পড়েছেন। আগামী ২৫ অক্টোবর শিল্পী সমিতির নির্বাচনকে ঘিরে আবার রীতিমত উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এফডিসি। নির্বাচন ঘিরে একের পর এক বিতর্কে পড়ছেন জায়েদ খান ও তার প্যানেল। বিগত দুই বছরে তাদের শাসনামল নিয়ে শিল্পী সমিতির দিকে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলছেন সিনিয়র শিল্পীরা।

সবকিছু নিয়ে জায়েদ খান সবার সাথে খোলামেলা আলোচনা করলেন

শিল্পী সমিতি’র নির্বাচন যতোই ঘনিয়ে আসছে, ততোই বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে কেন?
শিল্পী সমিতি নিয়ে আগে এতো উত্তেজনা ছিল না। গত দু’বছরে এতো কাজ করেছি, সমিতি এমন জায়গায় পৌঁছে গেছে, যার জন্য এটাকে সবাই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে চায় এবং সবাই এর মাধ্যমে নেতৃত্বে আসতে চায়। শুরু থেকে দেখছি সমিতির নেতৃত্বের এই চেয়ারটার প্রতি অনেক মানুষের আকাঙ্ক্ষা-বিদ্বেষ। ভালো কাজগুলোকে ম্লান করে কীভাবে ছোট করা এবং এখান থেকে সরিয়ে কেউ কেউ ব্যক্তি স্বার্থে সমিতিকে ব্যবহার করতে চায়। এ কারণে এত বিতর্ক ও সমালোচনা।

আপনার বিদায়ী কমিটির কয়েকজন নির্বাচিত সদস্য বলছেন, আপনিই ব্যক্তি স্বার্থে শিল্পী সমিতির সংগঠনকে ব্যবহার করছেন…?
যদি তাই হয়ে থাকে আমি তো নির্বাচনী জনসভায় গেলাম না! যদি আমি ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করে থাকি তাহলে আমার কমিটির নির্বাচিত ২১ জনের মধ্যে আসন্ন নির্বাচনে ১৫ জন আবার কীভাবে নির্বাচনের জন্য একই প্যানেলে রাজি হলো? আমি যদি সেলফিস হতাম, পুরো প্যানেলে আসন্ন নির্বাচনে একজনও থাকতেন না। মিশা সওদাগরের মতো বিচক্ষণ একজন মানুষ আমার সঙ্গে নির্বাচন করার জন্য রাজি হতেন না। এক্সিকিউটিভ কমিটির ৪-৫ জন সবাই কিন্তু আমার সঙ্গে আবার নির্বাচন করছেন। রোজিনা, অঞ্জনা, আলীরাজের মতো শিল্পীরা ব্যক্তি স্বার্থে সমিতিকে ব্যবহার করলে আমার সঙ্গে থাকতেন না। হয়তো বা ব্যক্তি স্বার্থে যারা সমিতিকে ব্যবহার করতে পারেনি, তারা এখন আমাকে ব্লেম (অপবাদ) দিচ্ছেন। কোথাও থেকে স্পন্সর আনলে সমিতির জন্য এনেছি, ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়।

গত দুই বছরে শিল্পী সমিতির আয়-ব্যয়ে গড়মিলের অভিযোগ রয়েছে। এটা নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?
এই অভিযোগ আমাদের সহ-সভাপতি (চিত্রনায়ক রিয়াজ) তুলেছেন, আর কেউ না। ওইদিন সাধারণ সদস্যদের ২৪২জন উপস্থিত হয়েছিল, তারা কেউ তোলেনি। রিয়াজ ভাইকে বলতে চাই, এই হিসেবের কথা আপনি কার্যনির্বাহী মিটিংগুলোতেও তুলতে পারতেন। ২৩ বার কার্যনির্বাহি কমিটির মিটিং হয়েছে। ২১ তম মিটিংয়ে সবার হাতে কাগজ তুলে দিয়েছি। তখন বলেননি কেন? যদি তখন আপনার কথা না শোনা হতো, আপনি পদত্যাগ করে চলে যেতেন। এনেছি, খরচ করেছি আমরা। এখন বলছেন আয়-ব্যয়ে গড়মিল! উনি এবার নির্বাচন করছেন না। তাই আমার মনে হয় এটা উদ্দেশ্য প্রণোদিত। সাধারণ শিল্পীদের কাছে হেয় করার জন্য ব্যক্তিগত কারণে করেছেন। আয়-ব্যয়ে ভয় থাকলে কখনো জেনারেল মিটিং করতাম না। মিটিংয়ের আগে ওডিট করে হিসেব সবার হাতে তুলে দিয়েছি।

আরও অভিযোগ, মধ্যরাত পর্যন্ত শিল্পী সমিতির অফিস খোলা রাখেন?
সমিতি খোলা থাকে সর্বোচ্চ ৯টা থেকে ১০ টা পর্যন্ত। মধ্যরাত পর্যন্ত কবে খোলা ছিল আমার জানা নেই! এফডিসির গেটে নিরাপত্তায় যারা থাকেন, তাদের কাছে জিজ্ঞেস করতে পারেন। যদি সত্যিই খোলা থাকে তাহলে অন্যায়। যতসময় খোলা থাকে এখানে কি বাইরের মানুষ আসে? রাত পর্যন্ত ফারুক-আলমগীর ভাই থাকেন, নইলে সমিতির সদস্য, পরিচালক, প্রযোজকরা থাকেন। এফডিসি মৃতপ্রায় হয়ে গিয়েছিল। সেটাকে শিল্পীদের উপস্থিতিতে চেয়েছি জীবিত করতে। এতে খারাপের কিছু দেখছি না। এখানে বাইরের মানুষ আসে না, মদ্যপান হয় না। সমিতির সংবিধানে কোথাও লেখা নেই সমিতি এতোটায় খুলতে হবে, আবার এতোটায় বন্ধ করতে হবে। এটা নিয়ে কেউ অভিযোগ করলে সেটা দুঃখজনক, আমার কাছে বেদনাদায়ক।

ভোটার তালিকা হালনাগাদেও সমিতির গঠনতন্ত্র মানা হয়নি এমন অভিযোগ এসেছে। সেখানে আপনি নাকি ব্যক্তিগত ক্ষমতা খাটিয়েছেন…?
ভোটপ্রদান করতে পারতো এমন কিছু শিল্পীকে যাচাই বাছাই করে সহযোগী সদস্য করা হয়েছে। সংবিধানের ৭(ঙ) ধারায় লেখা আছে, ‘ভুলবশত কখনো সমিতির সদস্যপদ দেওয়া হইয়া থাকে, অথচ তাদের যোগ্যতা নাই; সেক্ষেত্রে বর্তমান কার্যকারী পরিষদ যাচাই-বাছাই করিয়া সদস্যপদ পুনঃ মূল্যয়ন করিবার অধিকার রাখে’। আমাদের কমিটি পুনঃ মূল্যায়ন করেছি। এখানে আমি একা কিছুই করিনি। সোহেল রানা, ফারুক, আলমগীর, উজ্জ্বল, ইলিয়াস কাঞ্চন, হাসান ইমান, মাসুম বাবুল তাদের উপদেষ্টা মণ্ডলী গঠন করেছি তারাই করেছেন। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, ওইসব শিল্পীদের আরেকটু মানউন্নয়ন করা দরকার। সেজন্য তাদের পূর্ণ ভোটার থেকে সহযোগী সদস্য করা হয়েছে। তাদের কাজের উন্নতি হলে আবার পূর্ণ সদস্য করা হবে।

সংবিধানে লেখা আছে সব কমিটি মেয়াদের সময় নতুন সদস্যপদ দেওয়ার বিধান রাখে। এর আগের কমিটি ৮৫ জনকে দিয়েছে, তার আগের কমিটি ১১০ জনকে ইন্টারভিউ ছাড়াই সদস্যপদ দিয়েছে। ৪৮ জন সদস্য পদ চেয়েছিল তার মধ্য থেকে আমরা মাত্র ১৯ জনকে সদস্যপদ দিয়েছি, তাও ইন্টারভিউ সাপেক্ষে। সিনেমা নির্মাণের সংখ্যা এখন কম, তাই শিল্পীদের ছবি করাও কমে গেছে। সেজন্য আমাদের কার্যকরী পরিষদ সিদ্ধান্ত নেয় যদি তিনটা ছবি হয় ‘লিড ক্যারেকটার’-এ তাহলে আমরা তাদের সদস্যপদ দেব এবং জেনারেল মিটিংয়ে পাশ করে নেব। তিনটি ছবি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে যারা করেছে তাদেরকেই সদস্য করেছি। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দুটো ছবি করলেও তাদের সদস্য করিনি। কলা বিক্রেতা, নাপিত, মাছ বিক্রেতা শিল্পী সমিতির মেম্বার হয়ে থাক এটা চাই না। পেশাগতভাবে যারা শিল্পী তাদেরকেই রাখা হয়েছে। এখানে কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতা কাজে লাগাইনি।

শিল্পী সমিতির দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আপনি যতোটা সিরিয়াস, শুটিং-সিনেমা-ক্যারিয়ার নিয়ে আপনি ততোটা সিরিয়াস নন। কেন?
সমিতি, সংগঠন করতে গিয়ে আমার সিনেমা ক্যারিয়ার ধ্বংস হওয়ার পথে। এটা শতভাগ সত্য। শিল্পী সমিতির নির্বাচন, সাধারণ সম্পাদকের আসনে না থাকলে আমার ক্যারিয়ার বর্তমানে যে অবস্থায় আছে তারচেয়ে অনেক ভালো হতো। গত দুই বছর ৪-৫ ছবি মুক্তি পেত। সমিতিকে ভালোবাসার কারণে আমার ক্যারিয়ার পিছিয়েছে। ‘অন্তর জ্বালা’ মুক্তির পর আমার কাছে যে ধরণের ছবি আসছিল, সেগুলো করতে পারিনি সমিতির কারণে।

সমিতি নিয়ে এতো তৎপর হলেন কেন? একজন শিল্পীর মূল উদ্দেশ্যই থাকে সিনেমায় কাজ করা। তাহলে কাজটাকে কেন ফোকাস করলেন না?
নৌকার মাঝিকে বৈঠা নিয়ে বসেই থাকতে হয় পারাপারের জন্য। দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দেখলাম এই সংগঠনের জরাজীর্ণ অবস্থা। শিল্পীদের সংগঠনকে এভাবে দেখে কষ্ট পেয়েছিলাম। একটি ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান (নাম প্রকাশ করতে চাইলেন না) কিছু অনিয়ম করছিল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিয়ম করতে দাঁড়ালাম, তখনই এই দিকটায় ফোকাস চলে আসলো। এবার জয় পেলে সামনে থেকে কাজে মনোযোগ দেব।

২৫ অক্টোবর নির্বাচনের দিন বিশৃঙ্ক্ষলার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। এ বিষয়ে কী পদেক্ষপ?
বিশৃঙ্খলা যাতে না হয়, এজন্য ইলিয়াস কাঞ্চনের মতো একজন সর্বজন স্বীকৃত মানুষকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ করেছি। আমার মনে হয় না কোনো বিশৃঙ্ক্ষলা হবে। শিল্পীরা যাকে ইচ্ছে ভোট দেবেন। আমি যদি হারি, যিনি জিতবে তার গলায় মালা পরিয়ে দেব। পরদিন থেকে আবার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবো।

নির্বাচনে জয়ী হলে কোন কাজগুলো অবশ্যই করবেন?
প্রযোজক সমিতির নির্বাচন হয়ে গেছে তাই সিনেমা হল ঠিক করা, ছবির সংখ্যা বাড়ানো এগুলো নিয়ে চিন্তা নেই। এগুলো শিল্পী সমিতির কাজ না, প্রযোজকদের কাজ। দুটো বছর সমিতির জন্য উৎসর্গ করেছি। এবার ক্যারিয়ারে মনোযোগ দেব। এর বাইরে দুটি কাজ খুব বেশি দরকার। প্রথমত, প্রধানমন্ত্রীর সহায়তায় কিছু শিল্পীর জন্য আবাসান ব্যবস্থা চাইবো। যাদের বসবাসের অবস্থা খুবই বাজে। যেমন, প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের দিচ্ছেন, খেলোয়াড়দের দিচ্ছেন, সাংবাদিকদের দিচ্ছেন। আমিও তাঁর কাছে কিছু শিল্পীর জন্য আবাসন ব্যবস্থা চাইবো। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে চলচ্চিত্র শিল্পী কলাকুশলী কল্যাণ ফান্ড করবো ভেবেছি। তাদের অসুস্থতার জন্য সেখান থেকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।

শুনেছি, শিল্পী সমিতির ফান্ডে নাকি ৫০ লাখের বেশি টাকা আছে?
এগুলো ভুলভাবে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। পিকনিকে যেসব আয়োজন ছিল সেগুলো স্পন্সর হিসেবে কেউ স্টেজ করে দিয়েছে, কেউ জায়গা দিয়েছে। আমি এবং মিশা সওদাগর দুজনেই এগুলো ম্যানেজ করেছি। এগুলো ফান্ডের মধ্যে ধরলে হবে না। কমিটির তারকা শিল্পীদের কেউ সাহায্য করেনি। একটা বিষয় আজ জানাতে চাই। নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কে একটা অনুষ্ঠান করেছিলাম। ওই টাকায় আর্থিক অস্বচ্ছল শিল্পীদের জন্য ৮ লাখ টাকার ফান্ড করেছিলাম কল্যাণ ফান্ডে রাখার জন্য। সেখানে যেতে বিনা পারিশ্রমিকে কেউ কাজ করতে রাজি হয়নি। সেখানে থেকে ৪ লাখ টাকা নিয়েছে কমিটির সদস্য ফেরদৌস, পপি, সহ-সভাপতি রিয়াজ। তারা প্রত্যেকেই কল্যাণ ফান্ড গঠনের আয়োজন থেকেও ৫০ হাজার করে টাকা নিয়েছেন। অনেক কষ্ট নিয়েই কথাগুলো জানালাম। আমি, মিশা সওদাগর এবং মাসুম বাবুল এই তিনজন টাকা নেইনি। আরও কয়েকজন টাকা নিয়েছে অল্পকিছু। তাদের নাম জানাতে চাইনা। কারণ তারা কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য না।

শেষ প্রশ্ন, এবার একটু ব্যক্তিগত। পপির পর আপনি মাহিয়া মাহির সঙ্গে প্রেম করছেন। এমন গুঞ্জন শোনা যায়?
হাহাহা…! পপি এবং মাহি না, এছাড়া অপু বিশ্বাস, পরীমনির সঙ্গেও নাকি আমি প্রেম করেছি! যার সঙ্গে কাজ করি, কোথাও যাই তখনই এগুলো ছড়ায়। মাহির সঙ্গে আমার প্রেমের কথা ছড়ায় গত ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনে ফারুক ভাইয়ের নির্বাচনী প্রচারণায়। আমার কথা হলো মাহি বিবাহিত, তার স্বামী আছে। তার সঙ্গে প্রেম নিয়ে বলার কিছু দেখি না। সিনেমা জগতটা এমনই। আমি এগুলো শুনে শুনে অভ্যস্ত। বিয়ে করিনি, ব্যাচেলর আছি। কোথাও গেলে, খেতে বসলেই চুটিয়ে প্রেমের খবর ছড়ায়। আমি এগুলোতে বিভ্রান্ত হইনা বরং এসব আমার কাছে উপভোগ্য।


সাক্ষাৎকার এর সর্বশেষ খবর

সাক্ষাৎকার - এর সব খবর