ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গোঁপন তথ্য ফাঁস: নয়ন-মিন্নির আড়ালে যে কারণে রিফাতকে খু’ন করেন

২০১৯ জুলাই ২১ ১৩:৩২:৫৪
গোঁপন তথ্য ফাঁস: নয়ন-মিন্নির আড়ালে যে কারণে রিফাতকে খু’ন করেন

রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজী দুই ভাই। বাবা দুলাল ফরাজী। বাসা বরগুনা শহরের ধানসিড়ি রোডে। কিন্তু তাঁরা থাকতেন শহরের শেখ রাসেল স্কয়ার লাগোয়া জে’লা পরিষদ চেয়ারম্যানের বাসায়। জে’লা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জে’লা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে তাঁরা।

শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফকে কু‌‌’পিয়ে হ’ত্যার ঘটনায় দুই ভাইকে অগ্রভাগে দেখা গেছে। ছোট ভাই রিশান পেছন দিক থেকে রিফাত শরীফকে জা’পটে ধরে ছিলেন। আর বড় ভাই রিফাত ফরাজী দা দিয়ে কোপান। বড় ভাইয়ের সেই দায়ের আ’ঘাতে রিশানের হাতও অনেকটা কে’টে গিয়েছিল। রিফাতকে কোপানোর ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজে এমনই দেখা গেছে।

রাকিবুল হাসান ফরাজী ওরফে রিফাত ফরাজী ও রাশেদুল হাসান ফরাজী ওরফে রিশান ফরাজীকে যারা চেনে, তাদের অনেকেই বলছে যে দুই ভাইয়ের এই নি’র্মমতার নেপথ্যে নিশ্চয় কোনো কারণ রয়েছে। তারা বলছে, স্ত্রী’ আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির কারণে রিফাত শরীফের ওপর মা’মলার প্রধান আ’সামি, যিনি পু’লিশের সঙ্গে কথিত ব’ন্দুকযু’দ্ধে নি’হত হয়েছেন সেই সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন ব’ন্ড ক্ষুব্ধ থাকতেই পারেন। কিন্তু রিফাত ও রিশানের সঙ্গে এমন কী’ ঘটেছিল, যাতে রিফাত শরীফকে কু‌‌’পিয়ে খু’নের ঘটনার অগ্রভাগে ছিলেন তাঁরা?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, রিফাত শরীফের সঙ্গে গত মে মাসে জে’লা পরিষদ চেয়ারম্যানের স্ত্রী’ সামসুন্নাহার খুকি তথা রিফাত ও রিশানের খালার কথা-কা’টাকাটি হয়েছিল। খুকি ঘটনাটি দুই ভাইকে জানিয়েছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, সেই বিরোধের জের ধরেই দুই ভাই রিফাত শরীফের ওপর হা’মলার ঘটনার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির অগ্রভাগে ছিলেন।

কারণ গত ২৬ জুন সকালে রিফাত শরীফকে বরগুনা সরকারি কলেজের ফট’ক থেকে ধরে আনার আগে থেকেই রিফাত ফরাজীকে কলেজ ফট’কে অবস্থান এবং তাঁর সহযোগীদের নানা নির্দেশনা দিতে দেখা গেছে। হা’মলার প্রস্তুতি, হা’মলা ও ঘটনাস্থল ত্যাগ সব কিছু ধ’রা পড়েছে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরার এমন একটি ফুটেজ পু’লিশের কাছ থেকে পেয়েছে।

মাটিয়ালে যা ঘটেছিল

রাসেল স্কয়ারে সড়ক লাগোয়া নিজস্ব বাসা জে’লা পরিষদ চেয়ারম্যানের। বাসার প্রধান ফট’কের বাঁ পাশে চেয়ারম্যানের মালিকানাধীন দোকান। সেটি ভাড়া নিয়ে এক ব্যবসায়ী খাবারের হোটেল ‘মাটিয়াল ক্যাফে অ্যান্ড মিনি চায়নিজ’ করেছেন।

জানা গেছে, রিফাতকে কু‌‌’পিয়ে হ’ত্যার ঘটনার আগে গত ৫ মে মিন্নি তাঁর স্বামীকে নিয়ে ওই ক্যাফেতে গিয়েছিলেন। রিফাত শরীফ তাঁর মোটরসাইকেল চেয়ারম্যানের বাসার একেবারে সামনে সড়কের পাশে রাখার চেষ্টা করেন। তখন চেয়ারম্যানের স্ত্রী’ সামসুন্নাহার খুকি বাধা দেন। এ নিয়ে খুকির সঙ্গে রিফাতের বেশ কথা-কা’টাকাটি হয়েছিল। রিফাত তাঁর সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেন। তখন রিফাতকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন খুকি।

স্থানীয় লোকজন বলছে, জে’লা পরিষদের চেয়ারম্যানের একমাত্র প্রতিবন্ধী ছেলে কয়েক বছর আগে পানিতে ডুবে মা’রা যায়। তখন থেকেই দুই ভাই রিফাত ও রিশান তাঁদের খালা চেয়ারম্যানের স্ত্রী’কে মা বলে ডেকে আসছিলেন। তাঁরা দুই ভাই ওই বাসায়ই থাকতেন। এমনকি চেয়ারম্যানের স্ত্রী’ তাঁর ভাগ্নে রিফাত ফরাজীর সব অ’পকর্মে প্রশ্রয় দিতেন বলেও জানা গেছে।

এ রিফাতের বি’রুদ্ধে চারটি মা’মলা রয়েছে। তিনি একাধিকবার গ্রে’প্তারও হয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাঁর খালা চেয়ারম্যানের স্ত্রী’ খুকি প্রভাব খাটিয়ে তাঁকে জামিনে ছাড়িয়ে আনেন। খুকির সঙ্গে রিফাত শরীফের বাজে ব্যবহারের ঘটনাটি রিফাত-রিশানকে জানিয়েছিলেন তিনি।

শেখ রাসেল স্কয়ার রোডের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কর্ম’রত শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, রিফাতের সঙ্গে কথা-কা’টাকাটির পর জে’লা পরিষদ চেয়ারম্যানের স্ত্রী’ তাঁর মালিককে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘তোমাদের দোকানে বাজে ছেলেদের আড্ডা বসে। তাই এখান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে অন্যত্র চলে যাও।’ বিষয়টি তত্ক্ষণিকভাবে বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে জানানো হয়েছিল।

ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে মাটিয়াল ক্যাফের মালিক মুশফিক আরিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জে’লা পরিষদ চেয়ারম্যানের বাসার প্রবেশমুখের একটি স্টল তাঁদের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছিলাম। সেখানে খাবারের দোকান করেছিলাম।

বাসার সামনে মোটরসাইকেল রাখাকে কেন্দ্র করে মাস দেড়েক আগে রিফাত শরীফের সঙ্গে আমা’র দোকান মালিকের স্ত্রী’র কথা-কা’টাকাটি হয়েছিল। ওই ঘটনার পর জে’লা পরিষদের চেয়ারম্যান আমাকে স্টল ছেড়ে দেওয়ার জন্য দুই দিনের সময়সীমা বেঁধে দেন। তখনো ভাড়ার চুক্তির মেয়াদ দুই বছর ছিল। চেয়ারম্যানের চাপেই আমি ঘটনার ১০-১২ দিন পর দোকান ছেড়ে দিই।’

মিন্নি যা বলেছেন

নি’হত রিফাত শরীফের স্ত্রী’ আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি গত ১৪ জুলাই বরগুনা পৌর এলাকার মাইঠায় তাঁর বাবার বাসায় সংবাদ সম্মেলন করেন। এর আগের দিন তাঁর শ্বশুর আবদুল হালিম দুলাল শরীফ সংবাদ সম্মেলন করে তাঁর ছেলের হ’ত্যাকা’ণ্ডে পুত্রবধূ জ’ড়িত বলে অ’ভিযোগ করেন এবং মিন্নির গ্রে’প্তার দাবি করেন। সে ব্যাপারে বক্তব্য জানাতে ডা’কা সংবাদ সম্মেলনে মিন্নি ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, বরগুনা সরকারি কলেজ ফট’কের সামনে তাঁর স্বামীকে রিশান ফরাজী প্রথম পথ রোধ করেছিলেন।

রিশান তখন দাবি করেছিলেন, রিফাত শরীফ তাঁর মাকে (খুকি) অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেছেন। কেন করেছেন সেটা জানতে চান রিশান। ঠিক একই সময় রিফাত ফরাজী বলেন, ‘তুই (রিফাত) আমা’র চোখের দিকে তাকাইয়া ক, মাকে কেন তুই গালি দিয়েছো।’ তখন রিফাত-রিশানের সঙ্গে থাকা অন্য আ’সামিরা রিফাতের কাছে অ’স্ত্র আছে বলে চি’ৎকার করে এবং ধর ধর বলে তাঁকে কিলঘুষি মা’রতে শুরু করে।

মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রিফাত খু’নের কয়েক দিন আগে আমা’র মেয়ে ও জামাই মাটিয়াল ক্যাফেতে খেতে গিয়েছিল। তখন মোটরসাইকেল রাখা নিয়ে চেয়ারম্যানের স্ত্রী’র সঙ্গে রিফাতের কথা-কা’টাকাটি হয়েছিল। ঘটনার পর মিন্নি আমাকে বিষয়টি জানিয়েছিল। রিফাতকে কু‌‌’পিয়ে হ’ত্যার ঘটনার ভিডিও ফুটেজে রিফাত-রিশানকে যে ভূমিকায় দেখা গেছে, তাতে মনে হচ্ছে, সেই ঘটনার জের ধরেই তারা আমা’র মেয়ের জামাইকে কু‌‌’পিয়ে হ’ত্যা করেছে।’

ভিডিও ফুটেজেও দেখা গেছে, বরগুনায় রিফাত শরীফকে কু‌‌’পিয়ে হ’ত্যার ঘটনার আগে রিফাত ফরাজী কয়েকবার ঘটনাস্থল রেকি করেছিলেন। একাই দুটি দা বহন করেছিলেন। এর মধ্যে একটি দিয়েছিলেন নয়ন ব’ন্ডকে। অন্যটি দিয়ে রিফাত শরীফের ওপর রিফাত ফরাজী নিজেই প্রথম হা’মলা করেছিলেন।

রিফাতকে কলেজ ফট’ক থেকে তুলে নিয়ে আসা থেকে শুরু করে কু‌‌’পিয়ে রিফাত ফরাজীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছিল। কোপানোর শুরুর দিকে রিফাত শরীফের কোম’র জা’পটে ধরেছিলেন রিশান। আর রিফাত ফরাজী ও নয়ন ব’ন্ড যখন তাঁকে কোপাচ্ছিলেন তখন দায়ের আ’ঘাতে রিশানের হাতও কে’টে গিয়েছিল। এমনকি তিনি রাস্তায় ছিট’কে পড়েছিলেন। সূত্র: কালের কণ্ঠ


সমকালীন এর সর্বশেষ খবর

সমকালীন - এর সব খবর