ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ১২ কার্তিক ১৪২৭

‘আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়’

২০২০ সেপ্টেম্বর ২২ ১৫:০১:৩৮
‘আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়’

‘কোথাও অন্যায় দেখলেই প্রতিবাদ করত সোহাগ। নিষেধ করলে বলত মা, অন্যায়ের প্রতিবাদ কাউকে না কাউকে করতেই হয়। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করাই ওর কাল হলো। রিকশাওয়ালাকে মারধরে প্রতিবাদ করায় কলেজপড়ুয়া আমার সোহাগকে ওরা হত্যা করল। আর কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে

খালি না হয়।’

রিকশাওয়ালাকে মারধরের সময় প্রতিবাদ করায় গত ২৭ আগস্ট রাতে রাজধানীর উত্তরখানে রাজাবাড়ী খ্রিস্টানপাড়ায় কলেজছাত্র সোহাগকে (২০) ছুরিকাঘাতে হত্যা করে কিশোর গ্যাং ‘দি বস’ এর সদস্যরা। এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত কিশোর গ্যাংয়ের দুই সদস্য রাসেল ওরফে কাটার রাসেল (২০) ও মো. হৃদয়কে (২২) গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।

এ ব্যাপারে মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন নিহত সোহাগের মা মোছা. পারভীন বেগম।

মা পারভীন বেগম বলেন, ‘আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। যারা আমার বুক খালি করছে তাদের ফাঁসি চাই। সন্তানহারানোর যে কী জ্বালা, কষ্ট তা যেন আর কোনো মায়ের জীবনে না ঘটে।’

বাবা মো. আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘আমার ছেলে উত্তরা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। পাশাপাশি টঙ্গী বাজারে ভগ্নিপতির দোকান দেখাশুনা করত। আমার পাঁচ সন্তানের মধ্যে ছোট সোহাগ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী। ওকে নিয়ে স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এভাবে ছেলেটাকে খুন হতে হবে ভাবিনি।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ২৭ আগস্ট রাতে উত্তরখানের রাজাবাড়ী খ্রিস্টানপাড়া রোডের ডাক্তারবাড়ী মোড়ে কিশোর গ্যাং ‘দি বস’ এর হৃদয়, রাসেলসহ বেশ কয়েকজন সদস্য আড্ডা দিচ্ছিল। রাত সাড়ে ৮টার দিকে একই রাস্তা দিয়ে যাওয়া একটি রিকশার চাকা থেকে কাঁদা ছিটকে হৃদয়ের গায়ে লাগলে সে ক্ষিপ্ত হয়ে রিকশাচালককে মারধর করতে থাকে। একজন অসহায় রিকশাচালককে সমবয়সী একজন ছেলেকে মারতে দেখে সোহাগ এগিয়ে আসে।

সোহাগের প্রতিবাদে হৃদয় ও রাসেল ক্ষিপ্ত হয়ে ফোন করে তাদের গ্যাংয়ের অন্য সদস্য নাদিম, সানি, মেহেদী, সাদ, সাব্বিরসহ বেশ কয়েকজনকে ডেকে আনে এবং সকলে মিলে সোহাগের ওপর চড়াও হয়। এ সময় নাদিমের কাছে থাকা ধারাল ছোরা নিয়ে কাটার রাসেল সোহাগের পেটে উপর্যুপরি আঘাত করে পালিয়ে যায়। পরে হাসপাতালে নেয়ো হলে মারা যায় সোহাগ। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই বাদী হয়ে উত্তরখান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

র‌্যাব-১ তাৎক্ষণিকভাবে হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে দ্রুততার সাথে ছায়া তদন্ত শুরু করে। র‌্যাব-১ এর একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতরাতে দক্ষিণখান থানাধীন মোল্লারটেক থেকে মাহবুবুল ইসলাম ওরফে রাসেল ওরফে কাটার রাসেল ও মো. হৃদয়কে গ্রেফতার করে। তদের কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগজিন ও আট রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত আসামিরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। কাটার রাসেল জানায়, সে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ফায়দাবাদ আলিয়া মাদরাসায় দাখিল পর্যন্ত পড়াশুনা করে। বর্তমানে সে উত্তরা আইডিয়াল কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। সে হৃদয়ের নেতৃত্বাধীন কিশোর গ্যাং গ্রুপ ‘দি বস’ এর সদস্য।

এই গ্রুপ ‘হৃদয় গ্যাং’ নামেও পরিচিত। হৃদয়ের গ্যাংয়ের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তাদের সঙ্গে ওঠাবসা করার সুবাদে কোনো ঝামেলা হলেই সে পায়ের রগ কাটার ভয় দেখাত। সে প্রায় সময় ছুরি, ক্ষুর ইত্যাদি সঙ্গে রাখত। পায়ের রগ কাটার হুমকি দেয় বলেই সমবয়সী সবাই তাকে ‘কাটার রাসেল’ নামে ডাকে।

ঘটনার পর রাসেল গ্রেফতার এড়ানোর জন্য বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিল। কোনো স্থানেই সে এক-দুই দিনের বেশি অবস্থান করত না। হৃদয় জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, সে ষষ্ঠ শ্রেণির পড়াশুনা বাদ দিয়ে উত্তরায় একটি ওয়ার্কশপে কাজ শুরু করে। তার সাথে রাসেল, নাদিম, সানি, মেহেদী, সাদ, সাব্বিরসহ এলাকার উঠতি বয়সের কিশোরদের সু-সম্পর্ক থাকায় সবাইকে নিয়ে কিশোর গ্যাং ‘দি বস’ প্রতিষ্ঠা করে এবং তার নেতৃত্ব দেয়।

ঘটনার পর থেকে সকলকে আত্মগোপনে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে সেও আত্মগোপন করে। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তারা দেশ ত্যাগ করারও পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তবে তার আগেই গ্রেফতার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।


জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর