ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২০, ১৫ আশ্বিন ১৪২৭

বড় ধরনের দু:সংবাদ অপেক্ষা করছে প্রবাসীদের জন্য

২০২০ আগস্ট ০৮ ১৬:৫৪:০৬
বড় ধরনের দু:সংবাদ অপেক্ষা করছে প্রবাসীদের জন্য

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ গুলোতে অনেক বাংলাদেশী প্রবাসীরা রয়েছেন যারা কোন ধরনের কাজ না থাকার পরেও ‘ফ্রি ভিসা’ নিয়ে দেশ গুলো গিয়েছেন। িএবং পরে খোজ নিয়ে দাখা যায় যে এই ভিসা নিয়ে যারা প্রবাশে যায় তারা ওই দেশে গিয়ে শুধু স্থানীয় নাগরিকের অনাপত্তিপত্র নিয়েই করা যেত ব্যবসা কিংবা কাজ

কিন্তু করোনায় সেই পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। সৌদি আরবে এই ফ্রি ভিসায় অবস্থান করছেন কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই লাখ বাংলাদেশি। করোনার প্রভাবে তারাই সবচেয়ে বেশি কাজ হারানোর ঝুঁকিতে আছেন বলে মনে করছেন অভিবাসন খাত সংশ্লিষ্টরা।

করোনা পরিস্থিতিতে কী পরিমাণ কর্মী শ্রমবাজারের দেশগুলোতে কাজ হারাবেন কিংবা ফেরত আসবেন তার সঠিক হিসাব নেই কারও কাছে। তবে করোনা পরিস্থিতিতে প্রায় লাখ খানেক কর্মী বিদেশ যেতে পারেননি বলে জানিয়েছে জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রা। তারা এও আশঙ্কা করছে, যারা কাজ ছাড়া শুধু অন্য ভিসায় গেছেন তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা খুব বেশি।

বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি কর্মী যায় সৌদি আরবে। মোট অভিবাসনের প্রায় ৭৫ ভাগই এই দেশটিতে। ফেরত আসলে এই দেশ থেকেই আসার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা। তবে যারা নির্দিষ্ট কোম্পানির কাজ করেন তাদের ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা কমই দেখছেন তারা।

সৌদির বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ঢাকায় পাঠানো এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ৩ ক্যাটাগরির কর্মী ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা রয়েছে। যাদের আকামার মেয়াদ শেষ, যারা তথাকথিত ফ্রি ভিসায় বিভিন্ন পেশায় জড়িত এবং যাদের আকামার মেয়াদ আছে। তবে আকামার মেয়াদ যাদের আছে তাদের সংখ্যা খুব অল্প বলে মনে করছে দূতাবাস।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সূত্রে জানা যায়, এককভাবে শুধু সৌদি আরবেই আছেন ২০ লাখ বাংলাদেশি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে আছেন অন্তত ১৫ লাখ। এছাড়া কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইনে গড়ে তিন থেকে চার লাখ বাংলাদেশি আছেন। করোনা সমস্যার পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম একেবারেই কমে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে নানা সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া করোনার কারণে সংকটে আছেন মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে থাকা কর্মীরাও।

করোনা পরবর্তী আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারের পরিবর্তিত চাহিদা অনুযায়ী পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে ফেরত আসা কর্মীদের পুনরায় বিদেশ পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ। তিনি বলেন, ‘বিরূপ পরিস্থিতিতে ঝুঁকি কমানোর জন্য ভবিষ্যতে দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে।’ এছাড়াও তিনি মনে করেন, বিদেশফেরত কর্মীরা অভিজ্ঞতার বিবেচনায় দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য।

এই প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সৌদি আরবের অর্থনীতি আগের মতো নাও থাকতে পারে। আমরা কর্মীদের বিকল্প বাজারে কর্মসংস্থানের কথা ভাবছি। এ নিয়ে কাজ করছি। এছাড়া যেসব দেশে কর্মীরা কাজ হারানোর আশঙ্কায় আছেন সেসব দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত আছে।’

রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা যায়, তথাকথিত ফ্রি ভিসায় যারা এসেছেন তাদের বেশির ভাগেরই কাজ নেই। করোনা আসার আগে তারা মুক্তভাবে এখানে-সেখানে কাজ করতেন। এসব কাজের মধ্যে আছে গাড়ি ধোঁয়াসহ অন্যান্য ‘অড জব’। কিন্তু তারা কোনও কোম্পানি, কফিল বা নিয়োগকর্তার অধীনে ছিলেন না। যেমনটি নিয়মিত শ্রমিকদের বেলায় রয়েছে। বৈধ শ্রমিকরা যে কোম্পানিতে বা কফিলের অধীনে কাজ করেন তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে সেখানেই। অনিয়মিতদের সেই সুবিধা নেই। ফলে তারা এখন অর্থ এবং খাদ্যকষ্টে রয়েছেন। করোনা উত্তরণের পরপরই অনিয়মিত বা অবৈধ বাংলাদেশিদের বড় অংশকে নিজে থেকেই হয়তো দেশে ফিরতে হবে।

বায়রার মহাসচিব শামিম আহমেদ চৌধুরী নোমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কী পরিমাণ লোক ফেরত আসবে বা কাজ হারাবে এটার পরিসংখ্যান কারও কাছে নেই। লাখ লাখ কর্মী ফেরত আসবে, এটা সময় নির্ভর করে বলা হচ্ছে। বিদেশে কর্মরত অসংখ্য কর্মী আছেন, তারা কতজন ফেরত আসবেন এটা তো অনুমান করা যায় না। আমাদের দেশে যারা কাজে যেতে পারেনি সেটার পরিসংখ্যান আছে। ছুটিতে যারা এসেছেন কিন্তু ফেরত যেতে পারেনি তাদের সংখ্যা জানতে মন্ত্রণালয় একটি রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করেছে। এটা হলে একটা ধারণা পাওয়া যাবে। আমাদের এক লাখ কর্মী বিদেশ যেতে পারেনি, তাদের ভিসা আমরা প্রক্রিয়াধীন করছি। কতজন লোক ফেরত আসবে সেটা বলা বেশ কঠিন।’

নোমান বলেন, ‘যারা ভাসমান কাজ করতেন, আকামা হয়নি, কাগজপত্র কিছুই হয়নি, এ ধরনের ভাসমান কাজ এখন বন্ধ হয়ে যাবে করোনার কারণে। সেখানে বড় সংখ্যক একটি অংশের কাজ হারানোর একটা শঙ্কা আছে। সেই সংখ্যাটা দুই থেকে আড়াই লাখ লোকের। যারা কর্মরত আছেন, যাদের বৈধ কাগজপত্র সবই আছে, তাদের সংখ্যা খুব একটা বেশি হবে না। কারণ আমাদের গন্তব্য দেশগুলোতে যতদ্রুত সময়ে করোনা সংকট কেটে যাবে, তত কর্মীদের ফেরত আসার সংখ্যা এবং শঙ্কা দুই-ই কমে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু হলে আমাদের কর্মীরা যেসব সেক্টরে কাজ করেন, সেসব সেক্টরে ছাঁটাই করার আশঙ্কা একেবারেই কম। কারণ প্রতিদিনের জীবনে যা যা প্রয়োজন ওইসব সেক্টরে তারা কর্মরত। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলে ওই কর্মী ছাড়া দেশ চলবে না। সেক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি, যে পরিমাণ কর্মী বাইরে কর্মরত আছেন ওই পরিমাণে ফেরত আসার সম্ভাবনা কম। অনেকেই বলে লাখ লাখ লোক ফেরত আসবে– এগুলো সবই ধারণার কথা। তবে এটা নির্ভর করে আমাদের গন্তব্য দেশগুলো কত দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরত যাচ্ছে। যদি এই সময়টা আরও বাড়ে তাহলে অর্থনীতির ওপর আঘাত আরও বেড়ে যাবে। সেখানে আমাদের আরও বেশি কর্মীর চাকরি হারানোর সম্ভাবনা দেখা দেবে। এজন্য যত তাড়াতাড়ি গন্তব্য দেশগুলো স্বাভাবিক জীবনে ফেরত যেতে পারে ততই আমাদের মঙ্গল।’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রেফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি রিসার্চ মুভমেন্ট ইউনিটের (রামরু) প্রোগ্রাম পরিচালক মেরিনা সুলতানা বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে কোম্পানিতে যারা কর্মরত আছেন তাদের কাজ হারানোর ঝুঁকি কম। তবে যারা ফ্রি ভিসায় গিয়ে কাজ করছিলেন কিন্তু ভিসার মেয়াদ কমে আসছে, এরকম কেস আমরা পাচ্ছি যাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেই জায়গা থেকে একটা ঝুঁকি থাকে যে, যারা এতদিন ফ্রি ভিসা কিংবা নানাভাবে অনিয়মিত হয়ে কাজ করছেন, এই করোনা পরিস্থিতিতে তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা বেশি। পাশাপাশি কাজ আছে কিন্তু ভিসার মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে এরকম কর্মীদেরও কিন্তু পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে করোনার মধ্যে। সুতরাং সেই রিস্কও থাকছে। এছাড়া কোনও কোনও দেশ ক্ষমা ঘোষণা করছে, যাতে কর্মীরা একটি সিস্টেমে আবারও কাজে ফিরতে পারে। যাদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে তারা কিন্তু শূন্য হাতে ফেরত আসছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রাকৃতিক কিংবা অন্য কোনও দুর্যোগ অথবা রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে হোক, যেকোনও পরিস্থিতিতে প্রথম ভিক্টিম হয় অভিবাসী কর্মী। মূল কাজ না থাকায় অন্য একটি কাজ পেয়ে সে কিন্তু কাজটি করছে। এ‌ক্ষেত্রে আমাদের কর্মীদের ব্যবহার করে মজুরি চুরির ক্ষেত্রে লাভবান হচ্ছে গন্তব্য দেশগুলো। এভাবে করোনার প্রথম প্রভাব এসে পড়েছে আমাদের অভিবাসী কর্মীর উপর। আমরা কয়েক বছর ধরে জানি যে, মধ্যপ্রাচ্যে জাতীয়করণ করবে, ছাঁটাই করবে। কিন্তু যখন খাওয়া-পরা নিয়ে অনিশ্চয়তায় শ্রমিকরা, এই রকম দুর্বল পরিস্থিতিতে কীভাবে অভিবাসীদের ভিক্টিম হিসেবে ধরে নেয়। দেশে ফেরত পাঠানোর তো একটি নিয়ম আছে। তারা কাজ নিয়ে গেছে, তারা কিন্তু পাচারের শিকার না। তারা যে কাজ করছিল সেটাই একটা সিস্টেমে করুক, সবাইকে ধরে যাতে দেশে না পাঠায়। এর সঙ্গে আমাদের দরকষাকষিটাও সেভাবে থাকা দরকার। এখানে মানবিক একটা দৃষ্টিকোণ রাখতেই হবে।’


বহির্বিশ্ব এর সর্বশেষ খবর

বহির্বিশ্ব - এর সব খবর