ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রভাবে চট্টগ্রামে ঝড়ো হাওয়া, বৃষ্টি

২০২০ মে ১৯ ২১:০২:১৮
ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রভাবে চট্টগ্রামে ঝড়ো হাওয়া, বৃষ্টি

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সুপার সাইক্লোন আম্ফানের প্রভাবে বৃহত্তর চট্টগ্রামে শুরু হয়েছে বৃষ্টি, সেই সঙ্গে বইছে ঝড়ো হাওয়া। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতসহ বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকায় সাগর উত্তাল রয়েছে। মঙ্গলবার (১৯ মে) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ

মাজহারুল ইসলাম জানান, বর্তমানে সুপার সাইক্লোন রূপে আছে আম্ফান। ঘূর্ণিঝড়টি ধীরে ধীরে উপকূলের দিকে এগিয়ে আসছে। মঙ্গলবার শেষরাত নাগাদ ঘূর্ণিঝড়ের অগ্রভাগের প্রভাব পড়তে শুরু করবে। উপকূলের কাছাকাছি আসলে ও ভূমি স্পর্শ করলে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি কমতে থাকে। তাই শেষরাত থেকে আম্ফানের শক্তি কমতে পারে। শক্তি কমে সুপার সাইক্লোন থেকে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় রূপে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল অতিক্রম করতে পারে।

এদিকে প্রবল শক্তি নিয়ে ধেয়ে আসা সুপার সাইক্লোন আম্ফানের ফলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া আম্ফানের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ও ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সেবাসংস্থা।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন জাগো নিউজকে জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৪৭৯টি আশ্রয়কেন্দ্র। এছাড়া আরও প্রায় চার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। মজুদ রাখা হয়েছে শুকনা খাবার। গঠন করা হয়েছে মেডিকেল টিম। জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থাগুলোও ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ও ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে।

নৌবাহিনী জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় আম্ফান পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তায় চট্টগ্রামে তিনটি ও সেন্টমার্টিনে দুটি যুদ্ধজাহাজসহ নৌ কন্টিনজেন্ট ও মেডিকেল টিম মোতায়নের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এছাড়া মধ্য বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত নৌ-বাহিনী ও কোস্টগার্ডের সব জাহাজ নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের কুমিরা ঘাট থেকে সন্দ্বীপ ও হাতিয়ায় নৌ-যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। ‘অ্যালার্ট-৩’ জারি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক জানান, বন্দরে তিনটি ঘূর্ণিঝড় নিয়ন্ত্রণ খোলা হয়েছে। এরমধ্যে নৌ বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর : ০৩১-৭২৬৯১৬। পরিবহন বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর : ০৩১-২৫১০৮৭৮ এবং বন্দর সচিবের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর : ০৩১-২৫১০৮৬৯।

জেলার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রায় আট লাখ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবেন। এর মধ্যে ৪৭৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে পারবেন পাঁচ লাখ মানুষ। এছাড়া দুই হাজার ২৬৯ প্রাথমিক এবং এক হাজার ২৫০ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আরও তিন লাখ লোক আশ্রয় নিতে পারবেন। এছাড়া ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে দুই হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার, ৩৪৯ মেট্রিক টন চাল, ৬৮১ বান্ডিল ঢেউটিন এবং ৫০০টি তাঁবু মজুদ রাখা হয়েছে। যে কোনো জরুরি প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ফোন নম্বরে (০৩১-৬১১৫৪৫, ০১৭০০-৭১৬৬৯১) যোগাযোগ করা যাবে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির জানান, চট্টগ্রামে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে ২৮৪টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। সিভিল সার্জনসহ স্বাস্থ্য বিভাগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থল ত্যাগ না করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ১৯৪টি অ্যাম্বুলেন্স এবং পর্যাপ্ত স্যালাইন ও ওষুধ প্রস্তুত রাখা হযেছে।

করোনা নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদিকে সুপার সাইক্লোন আঘাত হানছে, অপরদিকে করোনা। দেশের প্রায় ১৯ জেলায় সরাসরি ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়বে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব বেশি থাকবে। প্রাণ বাঁচাতে বহুসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া হবে। এ সময় সাইক্লোন সেন্টারগুলোয় সামাজিক দূরত্ব মানানো দুরহ বিষয়। ফলে করোনার সংক্রমণ ঝুঁকি তৈরি হবে। সে কারণে নাগরিকদের প্রতি বিশেষ পরামর্শ, সেখানে অবস্থানকারীরা ১০০ ভাগ যেন মাস্ক ব্যবহার করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাইক্লোন সেন্টারে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে যথাসম্ভব স্বাস্থ্যকর্মী রাখার চেষ্টা করা হবে। এছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হবে এ বিষয়ে দেখভাল করা। শেল্টারগুলোতে যেহেতু সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কষ্টকর, তাই মাস্ক ব্যবহার করলে সংক্রমণ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে।’

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বি জানান, জেলায় ২৮৪ মেডিকেল টিম, দুই লাখ পিস পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, দেড় লাখ খাবার স্যালাইন ও পর্যাপ্ত জরুরি ওষুধ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকার করোনা আক্রান্ত রোগী এবং লকডাউন করা বাড়ির লোকজনদের নিকটবর্তী আইসোলেশন কেন্দ্রে নেয়া হবে এবং আশ্রয়ন কেন্দ্রে তাদের জন্য বিশেষ কক্ষের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. দেলোয়ার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘যেহেতু সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে করোনার কারণে, তাই আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে সংশ্লিষ্ট এলাকার অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রস্তুত রাখা হবে। এছাড়া সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য কে কোন আশ্রয়কেন্দ্রে যাবে তারও তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে, প্রতিটি ওয়ার্ডে থাকা স্কুল-কলেজ-মাদরাসা ব্যবহার করা হবে এবং বাড়ির কাছে থাকা স্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।’

এদিকে, সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স নিজস্ব জনবল ছাড়াও প্রস্তুত রেখেছে স্বেচ্ছাসেবকদের।

জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) ছয় হাজার ৬৬০ স্বেচ্ছাসেবক ও রেড ক্রিসেন্টের ১০ হাজার সদস্য প্রস্তুত রয়েছে।জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার পিস পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং এক হাজার ৪০০ পিস হাইজিন কিডস মজুদের খবর পাওয়া গেছে। সংগ্রহ করা হচ্ছে আরও এক লাখ পিস পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট। সচল রাখা হয়েছে টিউবওয়েল।


জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর