ঢাকা, বুধবার, ৩ জুন ২০২০, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সিনেমার জগৎটাকে মনে রাখতে চাই না

২০২০ মে ১৯ ১৮:৫৫:১৩
সিনেমার জগৎটাকে মনে রাখতে চাই না

‘আমি এই সিনেমার জগৎটাকে মনে রাখতে চাইনি। তাই ভাবিও না। অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার পর আগে শুধু এটা ভেবেছি, আমি কারও মা, কারও স্ত্রী, কারও বোন, কারও ভাবি, এই পরিচয়টা নিয়েই থাকতে চেয়েছি। সেভাবেই আছি। চলচ্চিত্র নিয়ে

আমার কোনো আফসোসও নেই। কারণ আমি সব ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছি।’ প্রথম আলোকে এমনটাই বললেন দেশের চলচ্চিত্রের একসময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা শবনম।

শবনমকে এখন দেখা যায় না চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট কোনো অনুষ্ঠানে। দেখা মেলে না টেলিভিশনের কোনো অনুষ্ঠানেও। তবে সমসাময়িক কিংবা তাঁর পরে যাঁরা চলচ্চিত্রে এসেছেন, তেমনি দু-একজনের বাড়ির কোনো আড্ডায় তাঁকে দেখা যায়। এরপর আবার ডুব। দেশের চলচ্চিত্রের একসময়ের জনপ্রিয় এই নায়িকা এখন সবকিছু থেকে নিজেকে আড়ালে রেখেছেন। নিজের মতো করেই থাকছেন বারিধারা পার্ক রোডের বাড়িতে।

নায়িকা হিসেবে জীবনের প্রথম ছবি ‘হারানো দিন’ সুপারহিট। ছবিটি মুক্তির পর অনেকে ওই ছবির গানের কারণেও তাঁকে ‘রূপনগরের রাজকন্যা’ও ডাকা শুরু করেন। ৫০–এর দশকের শেষে অভিনয়ে আসা এই নায়িকা অন্তরালে যাওয়ার আগে যে ছবিতে অভিনয় করেন, সেটিও সুপার-ডুপার হিট। ‘আম্মাজান’ ছবিটির পর আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়াননি একসময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা শবনম। চার বছর আগে স্বামী প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক রবীন ঘোষ মারা গেছেন। করোনার এই সময়টায় বাড়িতে সঙ্গী একমাত্র ছেলে রনি ঘোষ। দেশের চলচ্চিত্রের একসময়ের জনপ্রিয় এই অভিনিয়শিল্পী বলেন, ‘ছেলেটা দেশের বাইরে থাকত। ওর বাবা মারা যাওয়ার

পর থেকেই ঢাকায়। লকডাউনে ওর সঙ্গে আড্ডা হয়, গল্প করি।’

এখন কীভাবে সময় কাটান জানতে চাইলে শবনম বলেন, ‘পরিবার, শ্বশুরবাড়ি, আত্মীয়স্বজন নিয়ে ভালোই আছি। বাসায় থাকি। টেলিভিশন দেখি। ফেসবুকে সময় দিই। গান শুনি। জীবন তো চলেই যায়। নিজের পুরোনো ছবিগুলো দেখি। রবিনের গান অনেক শুনি। আলাউদ্দীন আলী, খান আতাউর রহমানের গানও শুনি। স্মৃতি নিয়েই আমি আছি।’

৭৯ বছর বয়সী শনবম এখনো নিজে বাজার করেন। ব্যাংকের কাজকর্ম সামাল দেন একা হাতে। নিজে রান্না করেন। ছেলের পছন্দের খাবারও রান্না করেন। বলেন, ‘আমি এমনিতেও বাসা থেকে বের হই না। আমার বাড়ির পাশেই শ্বশুরের বাড়ি। সেখানে যাওয়া-আসা করতাম। আড্ডা দিতাম। করোনার কারণে আর যাওয়া হয় না। লকডাউন শুরুর আগে এক মাসের বাজারসদাই করে নিয়েছিলাম। মাঝে আরেকবার করেছি। খুব প্রয়োজন ছাড়া এখন আর বাইরে বের হই না।’

চলচ্চিত্রের মানুষ শবনম দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্রের মানুষের খবরাখবরও রাখেন। সম্প্রতি ভারতীয় চলচ্চিত্রের দুই অভিনয়শিল্পী শশী কাপুর ও ইরফান খানের চলে যাওয়াটা তাঁকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছে বলেও জানালেন।

পুরান ঢাকায় বেড়ে উঠেছেন শবনম, বাবা ননী বসাক ছিলেন স্কাউট প্রশিক্ষক ও দেশের নামকরা ফুটবল রেফারি। ১৪ বছর বয়সে ‘এদেশ তোমার আমার’ সিনেমায় ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করেন, শবনমের মা উষা বসাক মেয়ের চলচ্চিত্রে অভিনয়ে সায় দেননি। বাবার সমর্থন নিয়েই এহতেশামের এই ছবিতে ছোট্ট চরিত্রে কাজ করার মধ্য দিয়ে অভিনয়ের শুরু। বলেন, ‘ছোটবেলায় আমি টমবয় ছিলাম। ঘুড়ি ওড়াতাম, ফুটবল ও ব্যাডমিন্টন খেলতাম, মহল্লার মধ্যে সব ধরনের দুষ্টামি করতাম। পড়াশোনায় খুব একটা মন বসত না। এসএসসি পাসের আগে অভিনয় শুরু। কলেজে উঠে বাবাকে বললাম, ‘আমি একসঙ্গে দুটো কাজ করতে পারব না। পড়া পারি না বলে কলেজে

শিক্ষকেরা বকা দেয়। এদিকে তত দিনে ছবির প্রতি আমার ভালো লাগাও তৈরি হয়। এরপর পড়াশোনা বাদ, ছবিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।’

এহতেশাম পরিচালিত ‘চান্দা’ ছবিটি ছিল শবনমের অভিনয়জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। ১৯৬২ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির পর শুধুই সামনের দিকে এগিয়ে চলা। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানে চলে যান। সেখানকার চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন। অভিনয়জীবনে এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে ১৮০টির মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন বলে জানান শবনম।

সিনেমার জীবন থেকে দূরে সরে থাকলেও সমসাময়িকদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে যোগাযোগ হয়। বলেন, ‘ফেরদৌসী আপা (ফেরদৌসী রহমান) আর রুনা লায়লার সঙ্গে যোগাযোগ আছে। পাকিস্তান থেকে রুনা লায়লার সঙ্গে আমার সম্পর্ক। তাঁর বড় বোন দিনা লায়লার সঙ্গে ছিল আমার দারুণ বন্ধুত্ব। সেই সূত্রে রুনা আমার ছোট বোনের মতো। সৈয়দ আব্দুল হাদী ভাইয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ হয়। তাঁরা আমাকে সম্মান করেন, আমিও তাঁদের সম্মান করি। ববিতা, চম্পা, সুচন্দার সঙ্গে আলাপ হয়। মৌসুমী ছিল, ওমর সানী, শাবনূর আমাকে খুব সম্মান করে, আমিও তাদের আদর করি।’

শবনমের পারিবারিক নাম ঝর্ণা বসাক। এহতেশামের ‘চান্দা’ ছবিতে তাঁকে শবনম নামটি দেন। ১৯৬৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর শবনম বিয়ে করেন সংগীত পরিচালক রবীন ঘোষকে। শবনমের একমাত্র বড় বোন নন্দিতা দাস কলকাতায় থাকেন। লকডাউনের আগে মাঝেমধ্যে বোনের কাছে বেড়াতে যেতেন তিনি।

বতর্মান চলচ্চিত্রের খবর খুব একটা রাখতে চান না বলে জানালেন শবনম। তিনি এটাকে ইন্ডাস্ট্রি বলতেও নারাজ। বলেন, ‘এটাকে কীভাবে ইন্ডাস্ট্রি বলি আমরা? চলচ্চিত্রের কারও সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলেন কী? না, আমি চুপচাপ থাকতে পছন্দ করি। আমি জানি, এসব বলে কোনো লাভ হবে না। এই ইন্ডাস্ট্রির আসলে কিছুই হবে না।’

শবনমের দৃষ্টিতে এখনকার চলচ্চিত্রে অনেক সমস্যা। বলেন, ‘আগের মতো মেধাবী পরিচালক নেই, গল্প লেখক নেই, টেকনিশিয়ান নেই। এখন তো কেউ ক্যামেরা চালাতে পারলেই সিনেমা হয়ে গেছে মনে করেন। সিনেমা বানাতে হলে গল্প জানতে হবে, গল্প বুঝতে হবে, গান বুঝতে হবে, সম্পাদনা বুঝতে হবে—আরও কত কী! আগে কাজকে সবাই ইবাদত মনে করত, তাই এসব কাজ কালের সাক্ষী হয়ে আছে। ৫০ বছরের বেশি সময় আমি সিনেমায় কাজ করেছি। ১৯৫৮ সালে প্রথম সিনেমায় কাজ শুরু করি। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানে যাই। এরপর আবার দেশে এসে কাজ করেছি। অগণিত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, এসবই আমাকে তৃপ্তি দেয়।’


ঢালিউড এর সর্বশেষ খবর

ঢালিউড - এর সব খবর