ঢাকা, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২০, ১৯ আষাঢ় ১৪২৭

মায়ের লাশ দাফন হয়,অথচ ছেলে মাটি দিতে পারে না

২০২০ এপ্রিল ২৩ ১৮:৪৩:৩৯
মায়ের লাশ দাফন হয়,অথচ ছেলে মাটি দিতে পারে না

করোনাকালে কবরস্থানে একটি করে লাশ নেওয়া হয় আর আতঙ্ক ভর করে স্থানীয়দের মধ্যে। এটা বাংলাদেশের ঘটনা এখন গড়ে প্রতিদিন ১০টা লাশের দাফন হচ্ছে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের তালতলা কবরস্থানে। গত ২৫ এপ্রিল থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত মোট ১৩৪টি লাশ দাফন করা হয়েছে সেখানে। এর মধ্যে গত ১০ দিন ধরে লাশের সংখ্যা বেশি বলে জানা গেছে।

তবে এই ১৩৪ জন ব্যক্তিই করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বিষয়টি এমন নয়। এদের ভেতরে কিছু লাশ দাফন করা হয়েছে করোনা সন্দেহে (উপসর্গ ছিল কিন্তু পরীক্ষা করা হয়েছে দাফনের পর)। ১৩৪টি লাশের ভেতরে অন্তত ১০০টি লাশের সঙ্গে কবরস্থানে যাননি তাঁর পরিবারের সদস্যরা। কারণ, ওই পরিবারের সদস্যরা কোয়ারেন্টিনে থাকায় তাঁদের দাফন করতে কবরস্থানে যাওয়া কিংবা জানাজায় দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল না।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে খিলগাঁও কবরস্থানের ইমাম নাসির উদ্দিন বলছিলেন, ‘এখনো পর্যন্ত তালতলা কবরস্থানে মোট ১৩৪ জনের লাশ দাফন করা হয়েছে। তবে এদের ভেতর কেউ কেউ করোনা সন্দেহে দাফন করা ব্যক্তি ছিল। গত ১০-১২ ধরে লাশের সংখ্যা বেশি। ইমাম আরো বলছিলেন, তবে করোনার আগে প্রতিদিন একটা বা দুইটা লাশ আসত। কোনোদিন হয়তো আসতই না।

তবে এই ‘করোনা সন্দেহে’ দাফন করা নিয়ে অনেকের ভেতরে আছে ক্ষোভ, আছে হতাশা। আছে প্রিয়তমা স্ত্রীর পাশে শেষবারের মতো দাঁড়াতে না পারার অভিমান! আছে মায়ের কবরে অন্তত এক টুকরা মাটি দিতে না পারার আক্ষেপ।

করোনাভাইরাসের উপসর্গ জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে মৃত্যু হয়েছিল মোহাম্মদপুরের রাবেয়া আক্তারের (৫০)। তখন স্থানীয়রা মোহাম্মদপুর থানায় জানান, রাবেয়া করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। পরে থানা পুলিশ গিয়ে রাবেয়ার লাশ উদ্ধার করে। পরে বিষয়টি সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে (আইইডিসিআর) জানলে লাশটি দাফনের অনুমতি দেয়। বাসা থেকে নিয়ে সেই লাশ দাফন করে আল মার্কাজুল ইসলামী নামের একটি সংস্থা। কিন্তু নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করার পর দেখে গেছে রাবেয়া করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাননি।

তাই রাবেয়ার মৃত্যু নিয়ে আক্ষেপ করতে করতে তাঁর স্বামী হারুন উর রশিদ বলেন, ‘তালতলা কবরস্থানে আমার স্ত্রীর লাশ দাফন করা হয়নি, দাফন করা হয়েছে আমাদের অন্তর, আমাদের স্বপ্নও। আমার ছেলের খুব ইচ্ছে ছিল, তার মাকে নিজের মতো করে অন্য কবরস্থানে দাফন করবে। আমার মেয়েটা তার মায়ের কবরে এক টুকরা মাটিও দিতে পারল না। পারল না মাকে শেষ দেখা দেখতে। আমার বাচ্চা দুটি ছটফট করে। তাদের এই অনুভূতি কে বুঝবে? অথচ লাশটি দাফনের আগে পরীক্ষা করলে আমরা সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতাম না আবার আমাদের ইচ্ছেমতো দাফন-কাফনও করতে পারতাম।’

তালতলা কবরস্থানের পাশের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম। প্রতিদিনের লাশ দাফনের ঘটনা বর্ণনা করে তিনি বলছিলেন, ‘প্রতিদিন কয়েকবার করে লাশ দাফন করা হয় এখানে। আমরা ঘর থেকেই এই দৃশ্য দেখতে পাই। কলিজাটা মনে হয় ছটফট করে সবসময়। আমার মা দাফনের দৃশ্য দেখেন আর নামাজে দাঁড়িয়ে কাঁদেন। মায়ের এই দৃশ্য দেখেও আমাদেরও মনটা খারাপ হয়ে যায়। প্রতিদিন এসব দেখতে দেখতে আরো অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। আল্লাহ মাফ করুক, নিরাপদে রাখুক আমাদের।’

কবরস্থানের ইমাম নাসির উদ্দিন বলছিলেন, ‘মার্চ মাসের ২৫ তারিখ থেকে এপ্রিল মাসের ২২ তারিখ পর্যন্ত মোট ১৩৪টি করোনার লাশ দাফন করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার সর্বাধিক ২২ জনের লাশ দাফন করা হয়েছে এখানে। গতকাল বুধবার দাফন করা হয়েছে ১২ জনের লাশ। গড়পর্তায় ১০ জনের লাশ দাফন করা হয় এখানে। তবে এই ১৩৪ জনের লাশের মধ্যে ১০০টি লাশের পরিবারের সদস্যরা কবরস্থানে আসেনি। কারণ, তারা ছিলেন কোয়ারেন্টিনে। বাকি ৩৪টি লাশের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনরা এসেছিল লাশ দাফনে। তবে লাশ দাফন করতে যেসব মানুষ এখানে এসেছিল দাফন শেষে তারাও কোয়ারেন্টিনে চলে গেছে।’

ইমাম আরো বলেন, ‘দাফন করা সব লাশকেই আমরা করোনার লাশ হিসেবেই দাফন করেছি। যদিও কিছু লাশ করোনা সন্দেহে দাফন করা হয়েছে। দাফনের পর পরীক্ষার ফলে অনেকের করোনা নেগেটিভ এসেছে। করোনা নেগেটিভ আসার পর এদের ভেতরে কেউ কেউ কবরস্থানে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। কান্নাকাটি করেছে। এ ছাড়া দু-একজন লাশ দাফনের পর এসেছে, কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কেঁদেছে। লাশের সঙ্গে আসতে না পারার জন্য কবর জিয়ারত করে ক্ষমাও চেয়েছে। এই কবরস্থানে আল মার্কাজুল ইসলামী, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন এবং রহমতে আলম নামের তিনটি প্রতিষ্ঠান লাশ দাফন করে থাকে।’


জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর