ঢাকা, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০, ২৬ আষাঢ় ১৪২৭

রক্তক্ষয়ী আন্দোলন থেকে একুশের গান

২০২০ ফেব্রুয়ারি ২০ ১২:৩৩:১৪
রক্তক্ষয়ী আন্দোলন থেকে একুশের গান

বায়ান্নর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল মাতৃভাষাকে শিকলমুক্ত করে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তা করতে গিয়ে জন্ম রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের। বায়ান্ন তাই ইতিহাসের পাতায় লেখা একটি অধ্যায় নয়, বাঙালি জাতির মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে তাই যুগ যুগ ধরে লেখা হয়েছে অগণিত গল্প, উপন্যাস, নির্মিত হয়েছে নাটক, চলচ্চিত্র। সৃষ্টি হয়েছে অগণিত গান। যেখানে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা, মাতৃভাষার প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসার কথা প্রকাশ পেয়েছে। অমর একুশের সেসব গান, নাটক, চলচ্চিত্র নিয়ে এ আয়োজন। আমরা যে বর্ণমালা শিখছি, তা দিয়ে তৈরি হচ্ছে ভাষা, আর সে ভাষায় প্রকাশ পাচ্ছে মনের ভাব।

জন্মগতভাবেই ভাষার প্রতি ভালোবাসা তৈরি হবে, এটাই মানুষের সহজাত ধর্ম। এ কারণেই মাতৃভাষাকে কেউ শিকল পরিয়ে রাখবে- এটা মেনে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বায়ান্নর রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম তারই জ্বলন্ত উদাহরণ। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্য শহীদ হয়ে বাঙালিরা প্রমাণ করেছে, তাদের মুখের ভাষা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।

ইতিহাসের সেই দিনটি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পেয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষাশহীদদের আজ আমরা স্মরণ করি শ্রদ্ধার সঙ্গে। ইতিহাসের সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলন থেকে একুশের গান সৃষ্টি হয়েছে শত শত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর লেখা ও শহীদ আলতাফ মাহমুদের সুরে 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি' গানটি শুধু ইতিহাসকে স্মরণ করায় না, বাড়িয়ে দেয় মায়ের ভাষা বাংলার প্রতি ভালোবাসা, হৃদয় করে আন্দোলিত।

১৯৫৪ সালের প্রভাতফেরিতে গানটি প্রথম গাওয়া হয়েছিল। সেই শুরু, এরপর প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে গানটি সম্মিলিত কণ্ঠে গাওয়া হচ্ছে। জহির রায়হান পরিচালিত 'জীবন থেকে নেয়া' ছবিতেও গানটি ব্যবহার করা হয়েছিল। একই ছবির 'এ খাঁচা ভাঙব কেমন করে' গানেও উঠে এসেছে ভাষা আন্দোলনের ছায়া। ভাষা আন্দোলনের পরের বছর গাজীউল হকের লেখা ও নিজামুল হকের সুর করা 'ভুলবো না, ভুলবো না সে একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলবো না' গানটি প্রথম ঢাকার আর্মানিটোলা ময়দানের জনসভায় গাওয়া হয়েছিল। এটিই মূলত একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম গান।

এর পাশাপাশি বিভিন্ন সময় এই দিনটি ঘিরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য গান। সে তালিকাও দীর্ঘ। আলতাফ মাহমুদের সুরের 'মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিল ভাষা বাঁচাবার তরে', 'রক্তে আমার আবার প্রলয় দোলা ফাল্কগ্দুনে আজ চিত্ত আত্মভোলা', আবদুল লতিফের লেখা ও সুরের 'ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়', ফজল-এ খোদার লেখা ও আবদুল জব্বারের সুর ও গাওয়া 'সালাম সালাম হাজার সালাম'সহ আরও অনেক গান আছে, যেগুলো ২১ ফেব্রুয়ারির শহীদদের কথা মনে করিয়ে দেয়।

চলচ্চিত্রের বাইরে বছর তিনেক আগে আমিও 'বর্ণমালা' শিরোনামের একটি গান করেছিলাম, যার শিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী ও সারেগামা একাডেমির শিশু শিল্পীরা। এই সৃষ্টির মূলে ছিল ভাষাশহীদদের কথা নতুন প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যেও অনেকে ২১ ফেব্রুয়ারি নিয়ে গান করেছে। এখনও গেয়ে যাচ্ছে নানা ধরনের গান, যেখানে ইতিহাসের সেই দিনটির কথা উঠে এসেছে।

ব্যান্ড এবং বাউল শিল্পীরাও ঐতিহাসিক এই দিনটি নিয়ে অসংখ্য গান তৈরি করেছেন। যেগুলো নাড়া দিয়ে যাচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। এটা হওয়ারই কথা। কারণ, ভাষার সঙ্গে আছে মা ও দেশের নিবিড় সম্পর্ক। আমরা নানা দেশের ভাষার চর্চা করলেও কখনও সেই স্বাদ খুঁজে পাব না, যা আছে মাতৃভাষায়। তাই এ ভাষায় শুধু সৃষ্টি নয়, এর গায়ে যেন ভিনদেশি ভাষার আঁচড় না লাগে, সেটা আমাদের দেখতে হবে।


সঙ্গীত এর সর্বশেষ খবর

সঙ্গীত - এর সব খবর