ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬

লোকে তো আমার বাস্তবতা জানে না :আরিফিন শুভ

২০১৯ সেপ্টেম্বর ১৯ ১৫:২৯:৫৯
লোকে তো আমার বাস্তবতা জানে না :আরিফিন শুভ

এক যুগেরও বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে তিনি অভিনয় করেছেন বিজ্ঞাপন, নাটক ও চলচ্চিত্রে। এখন পুরোদমেই চলচ্চিত্রের নায়ক আরিফিন শুভ। চলচ্চিত্রে নিজেকে রুচিশীল অভিনেতা হিসেবে প্রমাণ করতে সচেষ্ট তিনি। আসছে ২৭ সেপ্টেম্বর মুক্তি পাচ্ছে তার অভিনীত নতুন চলচ্চিত্র 'সাপলুডু'।

চলতি বছরের অন্যতম আলোচিত দুটি চলচ্চিত্র 'সাপলুডু' ও 'মিশন এক্সট্রিম'। দুটির নায়কই শুভ। দর্শকরা ছবি দুটির জন্য মুখিয়ে আছেন। আর শুভ ভক্তদের তো কথাই নেই। একই সঙ্গে অপেক্ষায় আছেন শুভও। তাই আড্ডার শুরুতেই আহ্বান জানালেন- আসুন 'সাপলুডু' আর 'মিশন এক্সট্রিম' নিয়ে কথা বলি। 'জাগো' ছবি দিয়ে বড় পর্দায় যাত্রা শুরু করা শুভর 'ঢাকা অ্যাটাক' ছবিতে পায় ভিন্ন মাত্রা। ছবিতে তাকে দেখে অনেকেই বলেন, শুভ বলিউড-হলিউডের নায়কদের চেয়ে কোনো অংশে কম নন। ফলে ধীরে ধীরে দর্শকদের কাছে শুভর প্রত্যাশার চাপ বাড়তে থাকে। শুভও বুঝতে পারেন তা। ছবিটি মুক্তির পর শুভ বলেছিলেন, 'এখন থেকে বছরে দশটা মানহীন ছবির চেয়ে একটি মানসম্মত ছবি করব।' শুভ তার কথা রেখেছেন।

ফলে 'ঢাকা অ্যাটাক' ছবির পর আর কোনো ছবিতে দেখা যায়নি তাকে। এই কয় মাসে এমন নয় যে, শুভর কাছে ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব আসেনি। এসেছে; কিন্তু সেগুলোর কোনোটিরই চরিত্র আর গল্প পছন্দ হয়নি বলেই তা ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি। ছবি ফিরিয়ে দেওয়ায় শুনতে হয়েছে কটু কথাও। কেউ কেউ তো বলেই বসেন শুভর পাখা গজিয়েছে। এসবের পরও 'না'তে অনড় থেকেছেন। মানহীন ছবিতে অভিনয় করবেন না শুভ। করেনওনি। তার সুফল 'সাপলুডু' আর 'মিশন এক্সট্রিম' ছবি। গোলাম সোহরাব দোদুলের 'সাপলুডু' মুক্তি পাচ্ছে আগামী সপ্তাহে। অর্থাৎ ২৭ সেপ্টেম্বর। শুভ বলেন, 'বলিউড, হলিউড, টালিউডের চলচ্চিত্রের মতো আমাদের বড় বাজেট নেই; কিন্তু আমাদের রয়েছে অনেক গল্প। 'সাপলুডু' তার নিজস্ব অবস্থান থেকে চেষ্টা করেছে দেশের মধ্যেই ভালো কিছু করার। এ ছবিতে আমাদের দেশের অনেক অভিনয়শিল্পী অভিনয় করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন তারিক আনাম খান, সালাউদ্দিন লাভলু, শতাব্দী ওয়াদুদ, মারজুক রাসেল ও বিদ্যা সিনহা মিম। ছবিটি দুর্গাপূজা উপলক্ষে মুক্তি পাবে। আশা করছি দর্শকরা ছবিটি বেশ ভালোভাবেই গ্রহণ করবেন।

'সাপলুডু' আর 'মিশন এক্সট্রিম' নিয়ে কথার পরপরই শুভ কিছুটা বিষণ্ণ। তিনি ফিরে গেছেন তার শৈশবে। আজ ঢাকাই ছবির নায়ক শুভকে আলো-ঝলমলে রঙিন পর্দায় মানুষ দেখেন। তার পৈতৃক বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার 'আংগারগারা' গ্রামে। আংগারগারা তার পৈতৃক নিবাস হলেও সেখানে থাকা হয়নি তার। এখন তো যাওয়াই হয় না। শুভর জন্ম ময়মনসিংহ শহরে, যে কারণে বেড়ে ওঠাও ময়মনসিংহ শহরেই। বাবা এস এম শামসুল হক ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। তিনি চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জেলায় বদলি হলেও শুভ থেকেছেন ময়মনসিংহ শহরেই। সেখানেই স্বপ্ন দেখেছেন। স্বপ্নকে লালন করেছেন। ছুটে এসেছেন ঢাকায়। আজ স্বপ্নসফল এক মানুষ শুভ। কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায় তাকে এনে দিয়েছে তারকাখ্যাতি। তারকা হওয়ার পরও ভোলেননি তার অতীত। ফলে সময় পেলেই পেছন ফিরে তাকান। স্মৃতি রোমন্থন করেন ফেলে আসা দিনগুলোর। ফেলে আসা অতীত, যা শুভকে দিয়েছে একের পর এক শুভ বার্তা। তাই জীবনে কোনো অতৃপ্তি নেই বলেও জানান শুভ। সবসময় হাসিখুশি হয়ে থাকার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি রয়েছে ভালো ভালো চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার তাড়না। আরিফিন শুভ প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান ২০০৩ সালে। বিটিভির এক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে, যা ছিল একটি 'ফ্যাশন শো'। শুভ বলেন, 'বিটিভির অনুষ্ঠানটির নাম মনে নেই। তবে যতটুকু মনে আছে, ঈদের একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান। প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মধ্যে কোনো অনুভূতি-উত্তেজনাই ছিল না। শুধু মনে ছিল, কোরিওগ্রাফারের কথামতো মঞ্চের সামনে হেঁটে সামনে যেতে হবে, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ফের ফিরে আসতে হবে। এতটুকুই। কোথায় ক্যামেরা? সামনে না পেছনে, এসব কিছুই মাথায় ছিল না। আসলে বোঝার বয়সও ছিল না।'

জীবনের প্রথম টিভিতে কাজ করলেও অনুষ্ঠানটি তার দেখা হয়নি। কারণ অনুষ্ঠানটির প্রচার শুরু হওয়ার পরপরই বিদ্যুৎ চলে যায়। স্মৃতি রোমন্থনের একপর্যায়ে জানতে চাওয়া হয়- আগে সংগ্রাম করেছেন, এখন কী করতে হয়? শুভ বলেন, 'এখনও সংগ্রাম করছি। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে প্রতিমুহূর্ত পার করছি। একটা সময় ছিল শুধু থাকা-খাওয়ার লড়াই, এখন মানসিক লড়াই। দ্বিধা, সংঘর্ষ ও বিভ্রান্তির মধ্য দিয়ে সামলে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। সিনেমা ভালো হোক এটার জন্য চেষ্টা করছি।'

২০১০ সালে মুক্তি পায় শুভ অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র খিজির হায়াত খানের 'জাগো'। চলচ্চিত্রে প্রায় নয় বছরের ক্যারিয়ার এ নায়কের। ক্যারিয়ার খুব বেশিদিনের নয়। তবে দেশের প্রথম সারির নায়ক এখন তিনি। নিয়মিত শরীরচর্চা করছেন। নিজেকে ফিট রাখতে যা যা করণীয় সব করছেন শুভ। কোনো চলচ্চিত্রের জন্য চরিত্রের প্রযোজনে ওজন বাড়ানো বা কমানোর বিষয়ে শুধু শুভকেই দেখা যায় ঢালিউডে। এ ছাড়াও অভিনয় শেখার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছেন এখন অবধি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে অভিনয়বিষয়ক স্কুলে মাসব্যাপী কর্মশালায় অংশ নিয়ে ২৮ আগস্ট দেশে ফিরে এসেছেন ঢাকা অ্যাটাকখ্যাত এ অভিনেতা। এই সময়ে এসে কর্মশালা করে অভিনয় শিখতে হচ্ছে? প্রশ্ন রাখতেই শুভর উত্তর। 'শেখার বিকল্প নেই, যারা অভিনেতা-অভিনেত্রী হিসেবে নাম করেছেন, সবাই শিখেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শিক্ষা নিতে চাই।

ভালো কাজের চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও শুভর কাজ নিয়ে সমালোচনা থাকেই। সম্প্রতি আয়নাবাজিখ্যাত অভিনেত্রী মাসুমা রহমান নাবিলার সঙ্গে বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনের শুটিং করেছেন। এ নিয়েও অনেকেই নানা কথা বলেছেন। 'হাতে ছবি নেই তাই বিজ্ঞাপনে মনোযোগ'- আসলেই কি তাই? শুভ জানালেন ইতিবাচক আর নেতিবাচক দুটিই জীবনের অংশ। একটি ছাড়া আরেকটি অচল। যারা আপনার পাছে কথা বলে, তাদের নিয়ে কিছু বলুন। না শুভ তাদের নিয়ে কিছু বললেন না। কূটনৈতিক উত্তর দিয়ে গেলেন। বললেন, 'আমার নিজের ওপর বিশ্বাস আছে। আমি গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসাব না। সে কারণে আমি প্রতিদিন একটি করে ছবির কাজে সাইন করব, সেটা আমার দ্বারা হবে না। আর না করলে আমি ডিপ্রেসড (বিষণ্ণ) হয়ে যাব, বিষয়টা এমন নয়'-উত্তরে বলেন শুভ।

শুভর ক্যারিয়ারের গ্রাফ লক্ষ করলে দেখা যাবে, একটি ছবি থেকে আরেকটি ছবিতে অভিনয়ের সময়ে রয়েছে বেশ দূরত্ব। ছবির সংখ্যা কম কিংবা এক ছবি থেকে আরেক ছবির সময়ের দূরত্ব থাকায় সমালোচনার শিকারও হতে হয়েছে তাকে। এ বিষয়ে এ নায়ক বলেন, 'আমার চরিত্র হচ্ছে, আমি ঘাপটি মেরে থাকি এবং বলি কম। আর ইন্ডাস্ট্রির লোকজন এ টাইপের বিষয়ে কে, কী বলল সেগুলো আমি একটু কম শুনি। লোকের কাজ তো বলা। তারা তো আমার বাস্তবতা জানে না। আমার সঙ্গে কী কী হয়, তা জানে না। ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রির এ সময়ের বাস্তবতা আমরা সবাই জানি। তার মধ্যেও কিন্তু আমি ছবি নিয়ে ছবি ফিরিয়ে দিচ্ছি। যে ছবিগুলো ফিরিয়ে দিয়েছি, আমার মনে হয়েছে সেগুলোতে কাজ করলে দর্শক প্রতারিত হবেন। ব্যবসায়ী আর শিল্পীর মধ্যে একটা পার্থক্য আছে, যেটা আমরা মাঝে মধ্যে গুলিয়ে ফেলি। যদিও এটা আমার রুটি-রুজি। এটা করেই আমি বেঁচে আছি। এটাই আমার পেশা। তাই বলে শুধু অর্থের জন্য কাজ করছি, সেটা শুধু জানানোর জন্য কিংবা দেখানোর জন্য, এটাতে আমি বিশ্বাসী নই। আমি বিশ্বাস করি, আমি ব্যবসায়ী নই, আমি শিল্পী।

এ প্রতিবেদনটি তৈরি করার আগে ঢাকাই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে কোন নায়ককে আপনার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে- এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল প্রায় ২০ দর্শককে। যাদের প্রশ্ন করা হয়, তাদের বেশিরভাগই শিক্ষিত এবং ঢাকাই সিনেমার নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন। এক বাক্যে বেশিরভাগই উত্তর দিয়ে দিলেন 'আরিফিন শুভ ইজ দ্য বেস্ট'। দু-একজন যে অন্য নায়কদের কথা বলেননি তা নয়। বলেছেন। তবে ভোটের পাল্লা শুভর দিকেই বেশি ছিল।

আরিফিন শুভ এখন ব্যস্ত আছেন নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামুলের 'জ্যাম' ছবির কাজ নিয়ে। অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে আসার পর প্রতিদিনই দিনভর শুটিং করতে হচ্ছে। এত পরিশ্রমেও এতটুকু ক্লান্ত নন তিনি। শুভ বলেন, 'দর্শকদের এমন ভালোবাসার জন্যই তো এতসব করা। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে শুটিং। আরও কত কী! আট-দশজন সাধারণ ছেলের মতোই শুভর জীবন। অন্য সবার মতোই পরিশ্রম আর স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে চান তিনি। আমরাও আশা করি শুভ তার অভিনয় আর মেধা দিয়ে দর্শকদের বিনোদিত করবেন। কারণ এখন চলছে তার শুভ সময়।


সাক্ষাৎকার এর সর্বশেষ খবর

সাক্ষাৎকার - এর সব খবর