ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩১ ভাদ্র ১৪২৬

সেই রেনুকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করা হয়

২০১৯ জুলাই ২২ ১৫:৫৯:০৬
সেই রেনুকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করা হয়

রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকায় স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছেলেধ’রা গুজবে কান দিয়ে গত শনিবার একদল নিষ্ঠুর মানুষ নৃ’শংসভাবে পি’টিয়ে হ’ত্যা করেছে তুবার মাকে। যখন তাকে এলোপাতাড়ি পে’টানো হচ্ছিল, হয়তো বারবারই তার চোখের সামনে ভেসে আসছিল তুবার মুখখানি। হয়তো তিনি বলে উঠছিলেন, তিনি ছেলেধ’রা নন, তারও ছেলেমেয়ে রয়েছে।

কিন্তু কিছুতে মন গলেনি গুজব-বিশ্বা’সী পাষণ্ডদের। স্বজনরা বলেছেন, তিনি ওই স্কুলে মেয়েকে ভর্তির খোঁজ নিতে গিয়ে মানুষরূপী একদল নির্বোধের চরম হিংস্রতার শিকার হন। যে মা একমাত্র মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, সেই মেয়ের আগামীটা ঘোর অন্ধকারই হয়ে রইল।

রেনুকে পি’টিয়ে হ’ত্যার ঘটনায় জ’ড়িত তিনজনকে গতকাল রাতে গ্রে’ফতার করেছে বাড্ডা থানা পু’লিশ। তারা হলেন- জাফর, শাহিন ও সাইদুল ইস’লাম বাপ্পি। তাদের মধ্যে জাফর ও শাহিন খিলক্ষেতের একটি কলেজের শিক্ষার্থী এবং বাড্ডায় বাপ্পির দোকান রয়েছে। তারা বাড্ডার বাসিন্দা। মোবাইল ফোনের ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্তের পর গ্রে’ফতার করা হয়।

স্বজনরা জানিয়েছেন, পারিবারিক কলহে স্বামী তসলিম উদ্দিনের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে তাসলিমা বেগম রেনুর। এরপরও দমে যাননি উচ্চশিক্ষিত উদ্যমী এই নারী। ছোট্ট দুই সন্তান তাহসিন আল মাহির (১১) ও তাসনিম তুবাকে নিয়ে শুরু করেন জীবনযু’দ্ধ। তবে বছরখানেক আগে ছেলেকে নিয়ে যান বাবা। এরপর তুবা ও ওর মা মহাখালীর ওয়্যারলেস গেট এলাকায় বসবাস শুরু করেন অন্য স্বজনের সঙ্গে। কিন্তু তিনি বরাবরই উদ্বিগ্ন ছিলেন মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

তাসলিমা’র ভাগ্নে সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু সমকালকে বলেন, ‘খালা দীর্ঘদিন বাড্ডা এলাকায় বসবাস করেছেন। তার শ্বশুরবাড়িও ওই এলাকায়। ছেলে তাহসিন বাড্ডার একটি বেসরকারি স্কুলে পড়ে। এ জন্য তিনি ওই এলাকায় নতুন করে বাসা খুঁজছিলেন। শনিবার নিজের অফিস বন্ধ থাকায় তুবাকে ওই এলাকার স্কুলে ভর্তির খোঁজ নিতে যান। আর সেখানেই ঘটে এমন নিষ্ঠুরতা।’ তিনি আরও বলেন, ‘এমন ঘটনার পরও তুবার বাবা খোঁজ নেননি। খালা গুজবের নিষ্ঠুরতার বলি হওয়ায় শি’শুটি এতিম হলো। মানুষের নিষ্ঠুরতায় ভবিষ্যৎ আরও বেশি অন্ধকার হলো ওর।’

রেনুর বোন সেলিনা আক্তার বিলাপ করে বলছিলেন, ‘এখন ওর সন্তানের কী’ হবে! কাকে মা বলে ডাকবে! কাকেই বা জড়িয়ে ধরে ঘুমাবে! যে রেনু জীবনে কোনো অ’প’রাধ করেনি, তাকেই অ’পবাদ দিয়ে হ’ত্যা করা হলো! আমি এর বিচার চাই।’

রেনু আসলে কেমন ছিলেন, তা জানতে প্রতিবেশী আর তার স্বজনদের সঙ্গে কথা হয়। তার সঙ্গে একই বাসায় থাকতেন ভাগ্নে সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু। তিনি বলেন, ‘খালা স্নেহপরায়ণ ছিলেন। একজন শিক্ষিত-সচেতন নারী। ছেলেধ’রা তো দূরের কথা, নূ্যনতম অ’প’রাধও করতে পারেন না তিনি। ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, হয়তো ওদের আগামী নিয়ে একটু মানসিক যন্ত্র’ণাও ছিল তার।’

তার কথার সত্যতা মিলল প্রতিবেশী রেহনুমা বেগমসহ কয়েকজন প্রতিবেশী নারীর কথায়ও। তাদের কথায় বেরিয়ে এলো রেনুর মহানুভবতার গল্পও। তারা বলছিলেন, রেনু নিজের অফিসের ফাঁকে আশপাশের বাসিন্দার শি’শুদের বিনামূল্যে পড়ালেখা করাতেন। এই কাজটা তিনি নিয়মিত করতেন এবং নিজের সন্তানদের মতোই অন্য শি’শুদের ভালোবাসতেন।

শনিবারের ঘটনা নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, রেনু স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকে কাউকে যেন খুঁজছিলেন। এতে সেখানে অ’ভিভাবকদের সন্দেহ হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে নেওয়া হয়। ততক্ষণে আশপাশে গুজব ডালাপালা মেলে- স্কুলে ‘ছেলেধ’রা’ নারী আ’ট’ক হয়েছে। শত শত লোক স্কুলে ঢুকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে তাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে পি’টিয়ে হ’ত্যা করে। কেউ কেউ ভয়ঙ্কর সেই দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে।

রেনু হ’ত্যাকা’ণ্ডের সঙ্গে জ’ড়িতদের ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাড্ডা থানার ওসি রফিকুল ইস’লাম জানান, রেনু কেন সেখানে গিয়েছিলেন, তা নিয়ে পু’লিশ এখনও পরিস্কার নয়। মেয়েকে ভর্তির বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার কথা বলা হলেও সরকারি স্কুলে সাধারণত জানুয়ারি মাসে ভর্তি শুরু হয়। এসব বিষয়ে ত’দন্ত চলছে। ওসি বলেন, ‘ওই নারী যে ছেলেধ’রা বা কোনো অ’প’রাধী নন, সে বিষয়ে পু’লিশ নিশ্চিত হয়েছে। তিনি গুজবে হ’ত্যাকা’ণ্ডের শিকার হয়েছেন। গণপি’টুনিতে জ’ড়িতদের মধ্যে তিনজনকে রাতে গ্রে’ফতার করা হয়েছে। জ’ড়িত অন্যদেরও গ্রে’ফতারের চেষ্টা চলছে।’

গ্রামের বাড়িতে দাফন সম্পন্ন :সমকালের লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, রেনুর বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজে’লার সোনাপুর গ্রামে। তার বাবা মৃ’ত আবদুল মান্নান। গতকাল রোববার ঢাকা থেকে তার ম’রদেহ গ্রামের বাড়িতে আনা হয়। সেখানে শত শত মানুষ ভিড় করেন। স্বজনরা বিলাপ করে এর বিচার চান। প্রতিবেশীরাও রেনু হ’ত্যায় জ’ড়িতদের বিচার দাবি করেন। তাসলিমা’র চাচাতো ভাই হারুন অর রশিদ জানান, রোববার তার ম’রদেহ বাড়িতে পৌঁছলে জানাজা শেষে রাত ৮টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

তুবার লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন স্থানীয় এমপি :রেনুর মেয়ে তাসনিম তুবার পড়ালেখার দায়িত্ব নিয়েছেন লক্ষ্মীপুর-২ আসনের এমপি কাজী শহীদ ইস’লাম পাপুল। গুজবে রেনুর প্রতি এমন নিষ্ঠুরতায় তিনি দুঃখও প্রকাশ করেন। তিনি জানান, এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে হ’ত্যাকা’ণ্ড কারও কাম্য নয়। তিনি রেনু হ’ত্যায় সুষ্ঠু বিচার পেতে পরিবারটিকে আইনি সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘এখন নি’হতের চার বছরের মেয়ে ও ১১ বছরের ছেলের পড়ালেখার খরচেরও দায়িত্ব নিয়েছি।’


সমকালীন এর সর্বশেষ খবর

সমকালীন - এর সব খবর