ঢাকা, শনিবার, ২৫ মে ২০১৯, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

পাক ডেরায় ৫৮ ঘণ্টা যেমন ছিলেন অভিনন্দন

২০১৯ মার্চ ০২ ২১:৪৬:৩৬
পাক ডেরায় ৫৮ ঘণ্টা যেমন ছিলেন অভিনন্দন

২৭ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১১টা থেকে ১ মার্চ রাত সাড়ে ন’টা। পাক ডেরায় বন্দি ৫৮ ঘণ্টা। এই দীর্ঘ সময় ধরে ভারত-পাক দুই দেশেই আলোচনার মূলে ছিলেন পাক ভূমিতে ভেঙে পড়া মিগ ২১ বাইসন যুদ্ধবিমানের চালক উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান। দেশে ফিরেছেন সদ্য। ৫৮ ঘণ্টা কেমন ছিলেন তিনি?

ঘটনার সূত্রপাত ২৭ ফেব্রুয়ারি। দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে জাতীয় যুব সংসদীয় উৎসব অনুষ্ঠানে বক্তব্য পেশ করে মঞ্চে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। হঠাৎই মঞ্চে এক আমলা চিরকুট গুঁজে দিলেন মোদীর হাতে। তাতে চোখ বুলিয়ে কপালের ভাঁজ চওড়া হল। দর্শকদের নমস্কার জানিয়ে বেরিয়ে গেলেন সঙ্গে সঙ্গে। কেন? কী হল হঠাৎ?

তার উত্তর মিলল কিছু ক্ষণের মধ্যেই। খবর এল, পুঞ্চ ও রজৌরি সেক্টরে হামলা চালিয়েছে পাক বায়ুসেনা। নিয়ন্ত্রণ রেখার কাছে পাক বিমান দেখেই জবাব দিতে নিমেষে আকাশে ওড়ে ভারতের যুদ্ধবিমান। তেমনই এক পাক এফ ১৬ –কে তাড়া করে ভারতের মিগ ২১ বাইসন। তার পর?

পাক বিমানকে গুলি করে ধ্বংস করেন ভারতীয় মিগ ২১ বাইসনের পাইলট অভিনন্দন বর্তমান। কিন্তু তত ক্ষণে পাক বিমান তাড়া করতে করতে তিনি ঢুকে পড়েছেন পাকিস্তানের আকাশসীমায়। ফেরার সময় পাক রাডারে ধরা পড়ে যায় তাঁর বিমান। পাক সেনারা গুলি করে নামান তাঁর মিগ ২১। বিপদ বুঝে নিজেকে ইজেক্ট করে প্যারাশুটে নেমে আসেন অভিনন্দন।

এর পরই তিনটি ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আনে পাক সেনা। প্রথমটিতে দেখা যায়, জঙ্গলে ঘেরা একটি নালার মধ্যে পড়ে আছেন ভারতীয় বায়ুসেনার এই অফিসার। দ্বিতীয় ভিডিয়োতে দেখা যায় চোখ বাঁধা, হাত পিছমোড়া করে বাঁধা অবস্থায় রক্তাক্ত অভিনন্দনকে ঘিরে রয়েছে পাক সেনা। এই ভিডিয়ো সামনে আসতেই প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায় দেশ জুড়ে।

পাক সংবাদপত্র ‘ডন’-এর দাবি অনুযায়ী, উত্তেজিত পাক জনতার মাঝে দাঁড়িয়েও ভয় পাননি অভিনন্দন। জানতে চাইছিলেন, এটা কোন দেশ? ভারত না পাকিস্তান? তাঁর পেট থেকে কথা বার করতে তখন তাঁকে আশ্বস্ত করে বলা হয়, তিনি ভারতের মাটিতেই আছেন বলে। কিন্তু অভিনন্দন বিপদের গন্ধ পেয়েছিলেন। সরাসরি প্রশ্ন করেন, ‘এটি ভারতের কোন জায়গা?’

জনতা জানায়, ‘এটি কিলান।’ অভিনন্দন তখন ভিড়ের উদ্দেশে জানান, তাঁর কোমরে খুব যন্ত্রণা।জল খেতে চান তিনি। ভারতীয় সেনার তেষ্টাকে আমলই দেয়নি সামনের ভিড়। বরং তাঁর সামনেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রশস্তি ও জয়ধ্বনি শুরু করে দেয় তারা।

এর পরই তাদের ছত্রভঙ্গ করতে শূন্যে গুলি ছোড়েন অভিনন্দন। নিমেষে উত্তেজিত পাক জনতা পাথর ছুড়তে শুরু করে ভারতের এই বায়ুসেনার উপর। বার বার জানতে চাওয়াহয় তাঁর নাম ও পরিচয়। কিন্তু জেনিভা কনভেনশনের কথা উল্লেখ করে বিরোধীদের চোখে চোখ রেখে, দৃপ্ত গলায় তাঁর সার্ভিস নম্বর ও পদমর্যাদা ছাড়া আর কিছু বলতে চাননি তিনি।

এর পর মুহূর্মুহূ আঘাত নেমে আসে তাঁর দিকে। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, পাথরের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে বন্দুক তাক করে প্রায় আধ কিলোমিটার পিছন দিকে দৌড়ান তিনি। তার পরেই ঝাঁপ দেন একপুকুরে। জলের মধ্যেই নিজের কাছে থাকা দরকারি ম্যাপ, কিছু দরকারি নথি জলে ভিজিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলেন।

এর পরই ভিড় থেকে তার পায়ে গুলি ছোড়া হয়। কিন্তু প্রবল মানসিক ও শারীরিক আঘাতও তাঁকে এতটুকু টলাতে পারেনি। কোনও গোপন তথ্য তো দূর, একটা এ দিক ও দিক প্রশ্ন ধেয়ে এলেই স্পষ্ট জানিয়েছেন, “আ’য়াম নট সাপোজড টু টেল ইউ স্যর।”এর পর জনতার হাত থেকে তাঁকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে আনে পাক সেনা।

পরের একটি ভিডিয়োতে দেখা যায়, ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা হলেও চোখে মুখে কালশিটে অভিনন্দনের। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে তিনি জানাচ্ছেন, আপাতত ভাল আছেন। পাক সেনারা তাঁর সঙ্গে ভাল ব্যবহার করেছেন, তাঁর কোনও অসুবিধা হয়নি। এমনকি দেশে ফেরার পরেও যে তিনি তাঁর বয়ান বদলাবেন না, জানিয়ে দেন তাও। বিরোধী শিবিরে দাঁড়িয়ে এমন সৌজন্য সকলকে মুগ্ধ করে।

বীর সেনাকে ফিরিয়ে দিতে কড়া অবস্থান নেয় ভারত। পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে তলব করে এই ঘটনার কড়া নিন্দা করে সাউথ ব্লক। মনে করিয়ে দেওয়া হয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও জেনেভা চুক্তির কথা। এই ঘটনায় নৈতিক ভাবে ভারতের পাশে দাঁড়ায় আমেরিকা, ফ্রান্স-সহ বিশ্বের তাবড় দেশ।

অভিনন্দনকে ফেরাতে দেশ জুড়ে শুরু হয় প্রার্থনা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের পক্ষ থেকে তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিনন্দনকে দ্রুত ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সব ধরনের চেষ্টার আশ্বাস দেওয়া হয়।অভিনন্দনের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে সরব হয় ভারত।

এর পর ঘরে-বাইরে চাপের মুখে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয় পাকিস্তান। পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সে দেশের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেন শান্তির বার্তা দিতেই ভারতীয় পাইলটকে ফেরানো হবে। ওয়াঘা-অটারী সীমান্ত দিয়ে তাঁকে শুক্রবারই ফেরানো হবে বলে জানান ইমরান।

উত্তেজনা ও উদ্বেগকে সম্বল করে ১ মার্চ সকাল থেকেই টিভির পর্দায় ওয়াঘা-অটারী সীমান্তের দিকে চোখ রেখে বসে ছিল গোটা দেশ। দুপুরের মধ্যে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও বার বার পিছোচ্ছিল সময়। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল উদ্বেগ। ইতিমধ্যে খবর আসে রাওয়ালপিন্ডি থেকে বিমানে নিয়ে আসা হয়েছে লাহৌরে। তার পর?

সেখানে অভিনন্দনকে দেওয়া হয় ভিসা। ইমিগ্রেশনের পরে কাস্টমসের কাজের প্রক্রিয়া শেষ করে তাঁর শারীরিক নানা পরীক্ষা হয়। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে তাঁকে সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দেন ইসলামাবাদে ভারতীয় দূতাবাসের এয়ার অ্যাটাাশে গ্রুপ ক্যাপ্টেন জে ডি কুরিয়েন ও পাক বিদেশ মন্ত্রকের ডিরেক্টর ফারেহা বুগতি।

সীমান্তে গেটের এ পারেভারতের প্রান্তে দাঁড়িয়েছিলেন বিএসএফের পদস্থ অফিসাররা। কমান্ডিং অফিসারকে নাগালে পেয়ে তাঁরা যেন বিহ্বল। হাত মেলালেন তাঁর সঙ্গে। এক অফিসার কাছে টেনে নিলেন পাইলটকে। স্যালুট করে ফিরলেন অটারীর দিকে। বন্ধ হয়ে গেল গেট।

তাঁকে ফেরত পেতে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বায়ুসেনার পদস্থ অফিসাররা। তাঁকে দেখতে সীমান্ত এলাকায় ঘেরাটোপের মধ্যেই ভিড় জমিয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। কনভয়ের দেখা পেতেই ভিড় চাঙ্গা! অভিনন্দনকে দেখতে না পেলেও কনভয়ের ছবিই ক্যামেরাবন্দি করলেন তাঁরা। সঙ্গে দেশাত্মবোধক স্লোগান।নাচ-গানে উদ্বেল হল জনতা।

এর পর কনভয় পৌঁছল অমৃতসর বিমানবন্দরে। সেখান থেকে দিল্লি নেমে সেখানকার সেনা হাসপাতালে ফের শারীরিক পরীক্ষা হয় তাঁর। দিল্লিতেই তাঁর পরিবার তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল। ঘরের ছেলেক ফিরে পেয়ে আত্মহারা তাঁরাও। মিতভাষী অভিনন্দন কেবল জানালেন, ‘দেশে ফিরে ভাল লাগছে।’ দে‌শও আবার গর্বিত হল এমন বীর পুত্রকে কাছে পেয়ে!

সুত্র: আনন্দবাজার।


বহির্বিশ্ব এর সর্বশেষ খবর

বহির্বিশ্ব - এর সব খবর