ঢাকা, বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৫

প্রবাসীদের কষ্টগুলো কেউ বুঝতে চান না, সৌদি প্রবাসীরা লেখাটি অবশ্যই পড়বেন!

২০১৮ মে ১৬ ০১:০৬:১৭
প্রবাসীদের কষ্টগুলো কেউ বুঝতে চান না, সৌদি প্রবাসীরা লেখাটি অবশ্যই পড়বেন!

ঘটনাটি গল্পের মতো করে বলার চেষ্টা করছি। কারণ-মানুষ গল্প শুনতে পছন্দ করেন। আর গল্প মন ছুঁয়ে দিতে পারে খুব দ্রুত। মানুষ মনেও রাখতে পারেন বহুদিন। একজন নাট্যকার চিত্রনাট্য লেখার পর যখন তা দৃশ্যে ফুটিয়ে তোলেন তখন তা সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

আমি একদিন বসেছিলাম রিয়াদের একটি সবজির দোকানে। দোকানদার আমার পরিচিত। ওখানে বসে থাকার সুবিধা হচ্ছে হরেক রকম মানুষের নানা রকম কর্মকাণ্ড দেখার সুযোগ হয়। কাছ থেকে না দেখলে যা বিশ্বাস করা যায় না।

সেদিন হঠাৎ দেখি এক ছেলে তার মাকে বলছে, ‘আম্মা আমার জন্য দোয়া করো, যেন তাড়াতাড়ি আমারে পুলিশে ধরে! আউট পাশ বন্ধ। বাড়িতে আসতে পারছি না। এখানে থাকতেও পারতেছি না। কাজ নাই। কাজ করলে টাকাও পাই না। খুব কষ্ট আম্মা।’

নীরবে চোখ মুছে নিচ্ছে ছেলেটি। পরে শুনেছিলাম, সেদিনই পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল ছেলেটি। হয়তো তার মায়ের দোয়াতেই। মায়ের দোয়া আল্লাহ কবুল করেছেন।
ঘটনাটা আরও একটু খোলাসা করে বলি। ইদানীং সৌদি-আরবের অবস্থা ভালো নয়। আগে মানুষ দশ লাখ টাকা দিয়েও এখানে আসতেন। কাজ ছিল। টাকা তুলতে সময় লাগত না। কিন্তু এখন কাজ নেই। আবার কাজ থাকলেও বেতন ঠিকঠাক পাওয়া যায় না। তাই মানুষের মধ্য খুব হতাশা। এমন অনেক নতুন লোক আছেন, যাদের পকেটে সকালের নাশতা খাওয়ার টাকাও থাকে না। বেশির ভাগ শ্রমিকই দেশে টাকা পাঠাতে পারছেন না। যাদের বউ-বাচ্চা রয়েছে তাদের অবস্থা ভয়ানক খারাপ। দেশেও ফিরতে পারছেন না। ঋণ করে বিদেশে এসেছেন। অনেকেই আবার দেশে ফেরার রাস্তা খুঁজছেন।

আমাদের বড় সমস্যা হচ্ছে, কাজ করার আগে ভাবি কম। কাজ করে হায় হায় করি। যারা দেশে ফিরতে চান তাদের মধ্যে দুই-চারজন আমি যে সবজি দোকানে বসেছিলাম সেই দোকানের মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তারা এসে সবজির দোকানে বসে থাকেন। পুলিশ এলে বলেন, আমি এই দোকানে কাজ করি। তাহলে পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে যায়। কারণ নিয়ম হচ্ছে, সবজির দোকানগুলোতে সৌদি নাগরিক থাকতে হবে।

সৌদি আরবে প্রতিটি জিনিসের দাম অনেকটাই বেড়ে গেছে। তার সঙ্গে বেড়েছে আকামা (রেসিডেন্ট আইডেনটিটি) সরকারি ফি। কমেছে কাজের সুযোগ। বছর কয়েক আগেও একজন শ্রমিক মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা রোজগার করতে পারতেন। কিন্তু এখন ভালো একজন টেকনিশিয়ানও তা পারেন না। কাজ করতে বাংলাদেশিরা ভয় পান না। ভালো কাজও জানেন তারা। অল্পদিনেই চলার মতো ভাষা শিখে নিতে পারেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কাজ করেও টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থার পরিবর্তন কবে হবে তা কেউ বলতে পারছেন না।

প্রবাসে ঠিকমতো বেতন না পেলে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে যায়। তখন খুব বলতে ইচ্ছা করে, এটা কোনো জীবন নয়। অথচ প্রবাসীরা জীবনের সঙ্গেই আছেন! কী অদ্ভুত তাই না। দার্শনিক ডেমোক্রিটাস মনে করেন, সব কিছুই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্লক দিয়ে তৈরি। আর এই ব্লক কখনো পরিবর্তন বা ধ্বংস হয় না। তিনি এই ÿক্ষুদ্র অংশের নাম দিয়েছেন পরমাণু।

ঠিক তেমনি প্রবাসীদের মনে মিশে থাকে কষ্টের পরমাণু কণা। যা কখনোই শেষ হয় না। আর তাদের সবচেয়ে বড় কষ্ট হচ্ছে, তাদের কষ্টগুলো কেউ বুঝতে চান না। এত কিছুর পরেও আমরা বিদেশে যাচ্ছি, যাব। কারণ, দেশে বসে কাজ করতে বড় লজ্জা আমাদের। বিদেশে এসে কাজ করতে লজ্জা নেই।

বিদেশে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার আগে ভালো করে একটু খোঁজ খবর করে যাওয়া দরকার। আজকাল একটি দেশের অবস্থা সম্পর্কে জানা খুব কষ্ট হওয়ার কথা নয়।
একটি দেশের অভিভাবক কে? আমার মনে হয় সরকার। সরকারিভাবে যেহেতু মানুষকে গাইডলাইন দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই, সেহেতু নিজেদেরই এ ব্যাপারে ভাবতে হবে। নিজের দেশে অনেক ছোট কাজ করা গর্বের। বিদেশে বড় কাজ করাও অগৌরবের।

কাজী সাইফুল ইসলাম: রিয়াদ, সৌদি আরব।


সমকালীন এর সর্বশেষ খবর

সমকালীন - এর সব খবর