ঢাকা, সোমবার, ২১ মে ২০১৮, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

ফরিদপুরে জোড়া খুন নিয়ে নানা রহস্য, আটক শিক্ষিকার স্বামী

২০১৮ মে ০৭ ২৩:৪৮:২৫
ফরিদপুরে জোড়া খুন নিয়ে নানা রহস্য, আটক শিক্ষিকার স্বামী

ফরিদপুরে জোড়া খুনের ঘটনায় সরকারি সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক সাজিয়া বেগমের (৩৫) স্বামী শেখ শহিদুল ইসলামকে আটক করেছে পুলিশ। তাঁর কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কিনা সে তথ্য এখনই বলতে রাজি নয় পুলিশ।

এদিকে এই জোড়া খুন নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন উঠছে। যার উত্তর মিলছে না এখনো। তবে কলেজ শিক্ষিকা ও সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তার মধ্যে আগের সম্পর্ক থাকা ও প্রেমের সম্পর্কের বিষয়ে কিছুটা নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ।

গতকাল রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ফরিদপুর শহরের দক্ষিণ ঝিলটুলি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে সহকারী অধ্যাপক সাজিয়া বেগম ও সোনালী ব্যাংক ঢাকার মতিঝিল করপোরেট শাখার লিগ্যাল মেটার বিভাগের প্রিন্সিপাল কর্মকর্তা ফারুক হাসানের (৩৭) লাশ উদ্ধার করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। ওই ফ্ল্যাট এক মাস আগে ভাড়া নিয়েছিলেন ফারুক হাসান। তাঁর পাশের ফ্ল্যাটে এক ছেলে নিয়ে ভাড়া থাকতেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা সাজিয়া বেগম। তাঁর স্বামী ঢাকায় মোটর পার্টসের ব্যবসা করেন। তাঁর বাড়ি রাজধানীর সুত্রাপুর থানাধীন বানিয়ানগর এলাকায়। ব্যাংক কর্মকর্তা ফারুক হাসানের বাড়ি রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায়। তবে তাঁর গ্রামের বাড়ি যশোর জেলায় বলে জানা গেছে।

ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএফএম নাসিম জানান, ফারুক হাসান ও সাজিয়া বেগম নিচতলায় পাশাপাশি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। বিকেল থেকে সাজিয়া বেগমের পরিবার তাঁকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। রাতে ফ্ল্যাটের মালিক ব্যাংকার ফারুক হাসানের দরজা খুলে দেখতে পান, তাঁর মরদেহ ঝুলছে। তা দেখে তিনি পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ গিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় ব্যাংকারের ও একই রুমের মেঝে থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় সাজিয়া বেগমের লাশ উদ্ধার করা হয়। এদের দুজনের গায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

ওসি আরো বলেন, ‘বিভিন্ন বিষয়কে ধরে আমরা তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। প্রাথমিক তদন্তে নিহত শিক্ষিকা ও ব্যাংক কর্মকর্তার মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল সেটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রথমে আমরাও ভেবেছিলাম শিক্ষিকাকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা। কিন্তু বেশ কিছু সিমটম থেকে এটিকে আত্মহত্যা বলে মনে হচ্ছে না। দুইটিই হত্যা বলে মনে করছি। বাকিটা তদন্ত করে আর ময়না তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে বিস্তারিত জানা যাবে।’

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরো জানান, নিহত ব্যাংক কর্মকর্তা তাঁর পরিচয় গোপন করে এখানে বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন। কয়েকদিন আগেই তিনি এই বাসায় ওঠেন। তাঁর দেহেও আঘাতের ক্ষত ছিল। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহত শিক্ষিকার স্বামী শেখ শহিদুল ইসলামকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

তবে শহিদুল ইসলামের কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কিনা সে তথ্য এখনই বলতে রাজি হননি ওসি। এই ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানান তিনি। পুলিশ সব কয়টি অ্যাঙ্গেল থেকে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

বাড়ির মালিকের ছেলে মাহবুবুল হাসান ডেবিড বলেন, রাতে রাজেন্দ্র কলেজের অভিষেক অনুষ্ঠান ছিল। রাত সাড়ে ১১টার দিকে অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফিরে নিচতলার ওই ফ্ল্যাটের দরজা খোলা দেখতে পান তিনি। দরজার ফাঁক দিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তার ঝুলন্ত লাশ দেখা যায়। ডেবিড বলেন, ‘আমি সঙ্গে সঙ্গেই থানায় গিয়ে পুলিশকে জানাই। পুলিশ এসে দুজনের লাশ উদ্বার করে।’

মাহবুবুল হাসান ডেবিড আরো জানান, নিহত কলেজ শিক্ষিকা প্রায় দেড় বছর আগে এই বাসা ভাড়া নেন। আর ব্যাংক কর্মকর্তা এক মাস আগে ভাড়া নেন। এক মাস আগে বাসা ভাড়া নিলেও তিনি থাকতেন না। দুদিন আগে তিনি বাসায় এসে উঠেছেন।

সরকারি সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহম্মদ সুলতান মাহামুদ হিরক বলেন, ‘ম্যাডাম রোববার কলেজে গিয়েছিলেন। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তিনি কলেজ থেকে বাড়ির জন্য বের হয়ে যান। এর পর রাতে জানতে পারলাম, ম্যাডামকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা অনেক খোঁজাখুঁজির পরে না পেয়ে থানায় যাই। ঠিক তখনই বাড়ির মালিকের ছেলে থানায় গিয়ে পাশের ফ্ল্যাটে লাশ ঝুলে থাকার খবর দেয়। সেই লাশ উদ্ধার করতে এসে পুলিশ ম্যাডামের লাশও উদ্ধার করে। খবর পেয়ে আমরা শিক্ষকরা ঘটনাস্থলে আসি।’

নিহত কলেজ শিক্ষিকার স্বামী শেখ শহিদুল ইসলাম জানান, রোববার বিকেল ৪টার দিকে স্ত্রীর সঙ্গে শেষ কথা হয় তাঁর। তখন তিনি জানান, বাসায় এসেছেন। এরপর রাত হয়ে গেলেও বাসায় না ফেরায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। তাঁর সহকর্মীদের জানানো হয়। কোথাও খুঁজে না পেয়ে থানায় গিয়ে জানানো হয়।

ফরিদপুর সদর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আতিকুল ইসলাম জানান, নিহত দুজন একই ফ্লোরের দুই ইউনিটের পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকতেন। বিকেল থেকে সহকারী অধ্যাপক সাজিয়া বেগমের পরিবার তাঁকে খুঁজে পাচ্ছিল না। রাতে ফ্ল্যাটের মালিক দরজা খুলে দেখতে পান, ব্যাংকার ফারুক হাসানের মরদেহ ঝুলছে। তা দেখে তিনি পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ গিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় ব্যাংকারের ও একই ঘরের মেঝে থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় নারী সহকারী অধ্যাপকের লাশ উদ্ধার করা হয়। তাঁদের দুজনের গায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন বিষয়কে ধরে তদন্ত এগিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

এদিকে দুজনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে।

অপরদিকে সরকারি সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক সাজিয়া বেগমের খুনের ঘটনায় দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তাঁর কলেজ। এর মধ্যে সোমবার দুপুরে তাঁর স্মরণে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া তারা দুই দিনের জন্য কালোব্যাজ ধারণ ও মঙ্গলবার সকালে কলেজের সামনে মানববন্ধন ও প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হবে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে।


জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর