ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

চিত্রনায়িকার ফুল বেচে জীবিকা, ছেলে এতিমখানায়

২০১৪ অক্টোবর ২৯ ২১:৪১:০৬
চিত্রনায়িকার ফুল বেচে জীবিকা, ছেলে এতিমখানায়

রাস্তায় ফুল বিক্রি করেন এক সময়কার জনপ্রিয় অভিনেত্রী বনশ্রী। বনশ্রী বাংলা চলচ্চিত্রের এক সময়কার জনপ্রিয় এবং পরিচিত এক অভিনেত্রীর নাম।

বাবা-মার হাত ধরে ৭ বছর বয়সেই শিবচর থেকে ঢাকায় আসেন। বাবা ঠিকাদারি কাজ করতেন। দুই বোন আর এক ভাই তারা।

বনশ্রী ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃতি চর্চার মধ্যে ছিলেন। উদীচীর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ভালো গান করতেন। অভিনয় শেখার জন্য সুবচন নাট্য সংসদে যোগ দেন, মহিলা সমিতি মঞ্চের দর্শকের কাছেও পরিচিত মুখ বনশ্রী। তারপর বিটিভির ‘স্পন্দন’ অনুষ্ঠানে নিয়মিত আবৃত্তি করেছেন। প্রায় দশটির মতো বিজ্ঞাপনচিত্রের মডেলও হয়েছিলেন তিনি। এরপরই চলচ্চিত্রে পা রাখেন। ‘সোহরাব-রুস্তম’ চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে তার বাংলা ছবির দুনিয়ায় অভিষেক হয়। আর প্রথম ছবিতেই হিরো ছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন।

এরপর তিনি ‘নেশা’, ‘মহাভূমিকম্প’, ‘প্রেম বিসর্জন’, ‘ভাগ্যের পরিহাস’ নামের চলচ্চিত্রগুলোতে অভিনয় করেন। তিনি বলেন, ‘চলচ্চিত্রে যখন কাজ শুরু করি, তখন থেকেই আমার টার্গেট ছিল জনপ্রিয় হিরোদের সঙ্গে কাজ করবো। তাই আমি মান্না, অমিত হাসান, রুবেল এদের নায়িকা হয়ে কাজ করেছি।’ চলচ্চিত্র প্রযোজক ফারুক ঠাকুরই তাকে ঢাকাই চলচ্চিত্রে ব্রেক দিয়েছিলেন।

সব কিছু ভালোই চলছিল। আলিশান বাড়ি, জীবন-যাপন। কিন্তু ফারুক ঠাকুর একটি খুনের মামলার আসামি হয়ে আত্মগোপন করলে একে একে সবাই সরে যান বনশ্রীর পাশ থেকে। ধীরে ধীরে বনশ্রীও শ্রীহীন হয়ে পড়েন রূপালী জগৎ থেকে। তারপর শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবনের পথচলা। নতুন এক গল্প। নিষ্ঠুর দুনিয়া নামে একটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন তিনি। কিন্তু ছবিটি শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়নি। এক সময়কার সেই ব্যস্ততম অভিনেত্রী এখন ফুটপাতে বসে ফুল বিক্রি করেন। কেন এই ফুল বিক্রি?

এবার বনশ্রী বলেন, ‘দেখুন আমি এর আগে বাসে বাসে বই বিক্রি করে সংসার চালাতাম। সংসার বলতে আমি আর আমার সাড়ে তিন বছরের ছেলে আপন (মেহেদী হাসান আপন)। কিন্তু ছেলেকে কোলে নিয়ে বাসে বাসে বই বিক্রি করাটা কষ্টের। এত কষ্ট আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। তাই ছেলেকে এতিমখানায় দিয়ে, এখন ফুল বিক্রি করছি।

আমি যখন নায়িকা ছিলাম, তখন প্রায় প্রতিদিনই ঢাকা ক্লাবে আসতাম কাজ না থাকলে। সেই ঢাকা ক্লাবের টেনিস মার্কার হিসেবে কাজ করতেন জীবন ভাই। তিনি একদিন আমাকে রাস্তায় দেখে বললেন, ‘আরে ম্যাডাম আপনি কেন বাসে বাসে বই বিক্রি করবেন। তখন তিনি আমাকে ফুল বিক্রি করার কাজ দেন।’

নিজের ক্যারিয়ার নষ্ট, সংসারও টিকলো না, মেয়ে বৃষ্টিকে হারালেন, এখন একমাত্র সম্বল শিশু সন্তান আপনকেও ঠিকমত লালন পালন করতে পারছেন না। এসব নানা কারণে বনশ্রী এর মাঝে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরে তিনি মানিকগঞ্জের আসক্তি পুনর্বাসন নিবাস আপনে চারমাস মানিসক চিকিৎসা নেন। আর ছেলেকে দিয়ে দেন সাভারের একটি এতিম খানায়।

বনশ্রী বই বিক্রেতা থেকে ফুল বিক্রেতা, এক সময় থাকতেন আলিশান ফ্ল্যাটে এখন শেখের টেকের বস্তিতে। ছেলে থাকে এতিমখানায়, তিন বেলা খাবারের নিশ্চয়তা নেই। এই পরিস্থিতির জন্য কাকে দায়ী করবেন আপনি? ফুলের রাজ্যে বনশ্রী উত্তর খুঁজে বেড়ান। তিনি বলেন, ‘দেখুন আমার আসলে সঠিক কোনো গাইড ছিল না বা আমাকে বুদ্ধি পরামর্শ দেয়ার লোক ছিল না।

ফারুক ঠাকুর যখন ঝামেলায় পড়েন আমি তখন একা হয়ে যাই। আমার কোনো ব্যাকআপ ছিল না। আমার বাবা মার কাছ থেকেও আমি কোনো সঠিক দিক নির্দেশনা পাইনি। এই শহরে একা একটি মেয়ে টিকে থাকার জন্য যে কী লড়াই করতে হয় তা আপনাদের জানা নেই।’

উপরে