ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর ২০১৭, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

অনিদ্রায় লুকিয়ে আছে মন খারাপের কারণ

২০১৪ অক্টোবর ২৭ ২১:৫১:০১
অনিদ্রায় লুকিয়ে আছে মন খারাপের কারণ

সাম্প্রতিক এক মেটা-অ্যানালাইসিস বলছ , বারবার ভেঙ্গে যাওয়া ঘুম, ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বপ্ন ডেকে আনে আত্মহত্যার প্রবণতা।

না, অবসাদ বা মনখারাপের রোগের সাথে এর কোনও সম্পর্ক নেই। বিভিন্ন কারণে অনিদ্রা, বিচ্ছিন্ন নিদ্রার অসুখে ভোগেন যারা, সংখ্যাতত্ত্বের হিসেব বলছে তাঁদের মধ্যে নেগেটিভ ইমোশন প্রবল, আত্মহত্যার কল্পনা বা প্রবণতাও বেশি। ১৯৬৬ সাল থেকে শুরু করে প্রায় দেড় লক্ষ মানুষের মধ্যে একই প্রবণতা লক্ষ্য করার পর ব্যাপারটি আর সমাপতন বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, মত গবেষকদের। অর্থাত্‍‌ কোনও রকম অবসাদ ছাড়াই যদি অনিদ্রার রোগে ভোগেন, তবে সতর্ক হোন আপনার নেগেটিভ চিন্তা-ভাবনার সম্পর্কে। আপনার অলক্ষ্যেই হয়তো আপনি মেলাঙ্কলিক হয়ে পড়ছেন।

অনিদ্রা রোগের সঙ্গে নেগেটিভ চিন্তার সম্পর্ক কারণ খুঁজতে গিয়ে চিকিত্সক ও গবেষকরা প্রাথমিক ভাবে দায়ী করছেন অস্বাভাবিক র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM) ঘুমকে। ঘুমকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়, নন র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট (NREM) ও র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM)৷ এই দু'রকমের ঘুম ঘুরে ঘুরে আসে স্বাভাবিক ঘুমের সময়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিদ্রা রোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট ঘুম ও সেই সময়ের স্বপ্ন। স্বপ্ন নিয়ে দেড় দশকের বেশি কাজ করছেন বিজ্ঞানী প্যাট্রিক ম্যাকনেমারা। তাঁর কথায়, যেহেতু র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট ঘুমের কাজ হচ্ছে সব রকম আবেগের সঙ্গে জড়িত স্মৃতিকে মগজের মধ্যে গুছিয়ে রাখা, তাই র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট ঘুমের প্যাটার্ন অস্বাভাবিক কম বা বেশি হলে আবেগের সঠিক মূল্যায়ন করে উঠতে পারে না মস্তিস্ক। পাঠক যদি মস্তিষ্ককে একটি প্রচুর তাক-ওলা লাইব্রেরি-ঘর হিসেবে চিন্তা করেন, যার মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য বিষয়ের না জানা বই (এক্ষেত্রে স্মৃতি), র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট ঘুমের সময় ওই সব বইকে বা স্মৃতিকে বিষয় অনুযায়ী গুছিয়ে তাকে তুলে ক্যাটালগিং করা হয়। তবেই যুক্তি নাগাল পায় সেই সব স্মৃতি ও আবেগের, এবং তাদের সঠিক ভাবে মূল্যায়ণ করাও সম্ভব হয়। র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট ঘুমের গোলমাল মানেই এই কাজগুলো ঠিকঠাক না হওয়া।

ফল ? বিষাদ ও নেগেটিভ চিন্তাভাবনা।

শুধু ভেঙ্গে যাওয়া ঘুম নয়, অতিরিক্ত দুঃস্বপ্নও হতে পারে এই প্রবণতার সিম্পটম৷ তাই ঘুম বিচলিত হলে উড়িয়ে দেবেন না, বরং ডাক্তার দেখান। অনেক ক্ষেত্রে স্বল্পস্থায়ী ভাবে ওষুধের প্রয়োগে র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট ঘুমকে একেবারে উড়িয়ে দিয়ে সুফল পাওয়া যায়। অনেক বিষাদ কাটানোর ওষুধই (antidepressant) র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট ঘুমকে কমিয়ে দেয়। তবে বেশিদিন একেবারেই র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট ঘুম না-থাকলে স্মৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

স্বপ্নে যখন নানা ঘটনা দেখি তা বিভিন্ন আবেগের স্মৃতিকে গুছিয়ে রাখার সময়ে দেখি। যুক্তি এই সময় ওই সব স্মৃতির উপর কাজ করে না, আর স্মৃতিগুলি গুছোনো-ও তখনও শেষ হয়নি, তাই, প্রথমত বিভিন্ন স্মৃতি মিশে স্বপ্নগুলি অদ্ভুতুড়ে হয়ে পড়ে। আর দ্বিতীয়ত, যুক্তি কাজ করেনা বলে ওই অদ্ভুত স্বপ্নগুলিকে শুধরানোও যায় না। কাজে কাজেই স্বপ্নে যা দেখি তা যে কোনও ভাবেই বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হতে পারে এমন বিশ্বাস রাখা ঠিক নয়। সে ভোরের স্বপ্নই হোক, বা স্বপ্নাদেশ। তবে, যেহেতু স্বপ্নে অন্তর্নিহিত আবেগ প্রতিফলিত হয়, তাই স্বপ্নব্যাখ্যা সাহায্য করতে পারে বিভিন্ন অচেনা ইমোশনকে চিনতে। ক্লিনিক্যাল সায়েন্স ও ক্লাসিক্যাল মনোবিদ্যায় এর অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আদৌ কি স্বপ্নব্যাখ্যার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে ?

লং ও শর্ট টার্ম মেমোরি সঞ্চয়ের প্রবক্তা নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী এরিক ক্যান্ডেল এক সাক্ষাত্কারে বলেন, নতুন নতুন প্রযুক্তি, যেমন পিইটি সিটি স্ক্যান বা এফএমআরআই ইত্যাদির মাধ্যমে ক্লাসিক্যাল স্বপ্নব্যাখ্যার স্নায়বিক ভিত্তি খুঁজে বার করা মনোবিদ্যার পক্ষে খুবই প্রয়োজনীয়, নইলে ফ্রয়েড-অনুগামী এই ধারা পরবর্তীকালে কেবল ইতিহাস হয়েই বেঁচে থাকবে৷ বহুদিন ধরেই স্বপ্ন বিশ্লেষণ মানসিক অসুস্থতার চিকিত্সায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে৷ বিশেষ করে ট্রমার চিকিত্সায় স্বপ্নবিশ্লেষণ বেশ প্রচলিত৷ যে কোনও বয়সেই, দুর্ঘটনাজনিত বা মানসিক আঘাতজনিত ট্রমা মানসিক গঠনকে ওলটপালট করে দিতে পারে৷ কোনও দুর্ঘটনার শিকার হলে সেটি যে বারবার ঘটবে না, এই যুক্তি মানার ক্ষমতা প্রায়শই নষ্ট হয়ে যায়৷ ট্রমাটাইজড ব্যক্তি মনে করতে থাকেন যে এই ঘটনা তার সাথে বার বার ঘটবে৷ সাইকো-অ্যানালিস্টরা প্রায়শই এমন রোগীকে দেখেন, যাঁরা দুর্ঘটনা ও মানসিক আঘাতের ফলে বাস্তবে ফিরে আসার রাস্তা খুঁজে পান না৷ নিজেদের অনুভূতি ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা যখন তাঁদের থাকে না, তখন অনেক সময়েই তাঁদের স্বপ্নের প্রতিপাদ্য চিকিত্সককে সাহায্য করে লুকিয়ে থাকা ওই ট্রমাকে চিনতে৷ ট্রমাটাইজড ব্যক্তি বারবার দুর্ঘটনার স্মৃতিজনিত স্বপ্ন দেখেন, যা ট্রমার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইন্ডিকেটর, একই সঙ্গে নেগেটিভ ইমোশনেরও পরিচায়ক৷ গল্প-সিনেমায় আমরা প্রায়শই দেখে থাকি মনোচিকিত্সায় সম্মোহনের প্রয়োগ। মনে করা হয়, হিপনোসিস বা সম্মোহনজনিত ঘুম কৃত্রিম ভাবে র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট উত্পন্ন করে, যাতে স্বপ্নের নাগাল পাওয়া যায়৷ হিপনোসিসে পেন্ডুলাম-এর ব্যবহার-ও সম্ভবত র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট তৈরি করার জন্য। যদিও হিপনোসিসের সময় এফএমআরআই করা হয়, তবেই নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। স্বপ্ন প্রকৃতির দেওয়া এক অসামান্য ওষুধ, মানুষের মানসিক চিকিত্সার জন্য। আণবিক রহস্য জানতে পারলে ও সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারলে স্বপ্নের থেরাপিউটিক সম্ভাবনা প্রচুর।

সোনালী সেনগুপ্ত, কলকাতা বসু বিজ্ঞান মন্দিরের গবেষক

উপরে